২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সোমবার ভারতের পার্লামেন্টে মনসুন অধিবেশনের শেষ সপ্তাহের প্রথম দিন ছিল। গুরুত্বপূর্ণ বিল পাশের তাড়া, রাজধানীতে রাজনৈতিক ব্যস্ততা আর উত্তাল পার্লামেন্টের মাঝেও ভারত সরকারের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা নজর রাখছিলেন বাংলাদেশে চলমান এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকটের দিকে।

বাংলাদেশে বিরোধী দলের “মার্চ টু ঢাকা” কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে গোটা রাজধানী উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। লাখো বিক্ষোভকারীর ঢাকামুখী অভিযানে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা চরমে পৌঁছায়। এমন একটি পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবেন, তা নিয়ে ভারতীয় পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা মহলে গভীর মনোযোগ ছিল।

যদিও গোয়েন্দা রিপোর্টগুলো বলছিলেন, শেখ হাসিনা সংকটে থাকলেও তা উতরে যাবেন, কিন্তু বিকেলের পরপরই চিত্র পাল্টে যায়। এক নাটকীয় মোড় নেয় ঢাকার রাজনীতি। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন এবং দ্রুত ভারত সফরের জন্য দিল্লির কাছে অনুরোধ জানান।

প্রথম ফোনটি আসে শেখ হাসিনার দপ্তর থেকে। ভারতে আশ্রয়ের অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী নিজেই। এরপর বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ভারতের কাছে তাদের সামরিক বিমানকে অবতরণের অনুমতি চেয়ে দ্বিতীয় ফোন করে। হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে শেখ হাসিনাকে বহনকারী C-130 বিমানটি অবতরণ করে রাতেই।

ভারতীয় নিরাপত্তা সূত্র জানায়, ঢাকায় সহিংস আন্দোলনের মধ্যে শেখ হাসিনার প্রাণরক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীই তাকে দ্রুত দেশের বাইরে পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা বোঝে। তবে ভারত সরাসরি সেনা বা বিমান পাঠাতে রাজি হয়নি। বরং সিদ্ধান্ত ছিল, শেখ হাসিনা নিজ দেশের সামরিক বিমানেই ভারতে আসবেন।

এদিন ঢাকায় ভারত-বিরোধী উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারে ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনা ভারতীয় গোয়েন্দাদেরও চমকে দেয়।

হাসিনার আগমন ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হয়ে ওঠে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কড়া নজর রাখেন গোটা পরিস্থিতির ওপর।

৬ আগস্ট সকালে সর্বদলীয় বৈঠকে শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শংকর। তিনি বলেন, মানবিক কারণে ভারতের এই সিদ্ধান্ত, এবং এটি সম্পূর্ণ \"সাময়িক\" ছিল বলে উল্লেখ করেন।

প্রথমদিকে শেখ হাসিনার গন্তব্য ব্রিটেন বলেই ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার নতুন প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে শেখ হাসিনাকে সে মুহূর্তে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে তার দিল্লিতে অবস্থান দীর্ঘায়িত হয়। ভারত সরকার পরে স্পষ্ট জানায়, তারা শেখ হাসিনাকে “স্বল্পমেয়াদে” আশ্রয় দিয়েছে।

৫ আগস্ট সন্ধ্যায় হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানান ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। এরপর থেকে শেখ হাসিনার নিরাপত্তা, আবাসন ও যোগাযোগ পুরোপুরি ডোভালের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।

প্রবীণ কংগ্রেস নেতা প্রণব মুখার্জির মতো যেভাবে তিনি এক সময় প্রবাসী হাসিনার অভিভাবক ছিলেন, এখন সেই ভূমিকাই পালন করছেন ভারতের 'স্পাই মাস্টার' খ্যাত ডোভাল।