স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি)। ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহের মধ্যবর্তী শান্তিডাঙ্গা-দুলালপুরে যাত্রা শুরু করা এই উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান চার যুগ পেরিয়ে আজ ৪৭ বছরে পা রাখছে। বর্তমানে ৮টি অনুষদ ও ৩৬টি বিভাগে প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষার্থী এখানে অধ্যয়ন করছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, প্রাপ্তি ও ভাবনার কিছু অনুষঙ্গ তুলে ধরেছেন মিরর নিউজের ইবি প্রতিনিধি।

নম্বরপত্র: শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও ইবিতে নম্বরপত্র সংগ্রহ এখনও শিক্ষার্থীদের জন্য বড় এক দুর্ভোগ। ৪–৫ বছরের পড়ালেখা শেষে নম্বরপত্র নিতে গিয়ে এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ছুটোছুটি করতে হয়। ‘লাঞ্চের পর আসুন’, ‘আগামীকাল আসুন’—এ ধরনের কথায় শিক্ষার্থীরা বারবার হয়রানির শিকার হন।
প্রত্যাশা: পুরোনো জটিলতা বাদ দিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি দ্রুত ডিজিটাল করা হোক।
— তাজমিন রহমান, ফোকলোর স্টাডিজ বিভাগ

মানবতা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে এক যাত্রা

১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর ইবি জ্ঞান, মানবতা ও সংস্কৃতির সেতুবন্ধন ঘটিয়ে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে—তবে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ঘিরে ভালোবাসা ও প্রত্যাশা অপরিবর্তিত।
তবু সেশনজট, পরিবহন সংকট এবং দীর্ঘদিনের নাম বিভ্রাট এখনো দুশ্চিন্তার কারণ। এর মধ্যেও নতুন বিভাগ, গবেষণার অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও সহনশীলতার চর্চা বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিচ্ছে।
প্রত্যাশা: আধুনিক অবকাঠামো, নীতিগত শক্তি ও সময়োচিত পদক্ষেপের মাধ্যমে ইবি যেন হারানো সময় পুষিয়ে নিতে পারে।
— রবিউল ইসলাম, ইংরেজি বিভাগ

স্বপ্ন নিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে—তবু নানা সংকটে জর্জরিত ইবি

প্রতি বছর শত শত শিক্ষার্থী স্বপ্ন নিয়ে ইবিতে ভর্তি হয়। কিন্তু ৪৬ বছর পার হলেও সেশনজট, নিরাপত্তাহীনতা, চিকিৎসাসেবার ঘাটতি, আবাসন সংকট ও গবেষণায় উদাসীনতা—এসব সমস্যা রয়ে গেছে।
সম্প্রতি পরিকল্পিতভাবে এক শিক্ষার্থী হত্যার পরও প্রশাসনের সুস্পষ্ট পদক্ষেপ না থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।
প্রত্যাশা: এসব মূল সমস্যা দ্রুত সমাধান করে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা।
— আফরিন আক্তার মৌ, ইংরেজি বিভাগ

শিক্ষার মান ও গবেষণা উন্নয়নে প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ

বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য বিশ্বমানের শিক্ষা প্রদান। এর জন্য প্রয়োজন মানসিক বিকাশের পরিবেশ, আধুনিক ল্যাব, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা ও গবেষণায় প্রণোদনা।
গবেষণা খাতে পিছিয়ে থাকার কারণে বিভিন্ন র‌্যাঙ্কিংয়ে ইবির অবস্থান নিচের দিকে।
প্রত্যাশা: একাডেমিক কার্যক্রমে কঠোর নজরদারি, দক্ষতানির্ভর শিক্ষা এবং গবেষণা-সুবিধা বৃদ্ধি।
— আজিজুল ইসলাম, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিস

স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়—তবুও অনেক খাতে পিছিয়ে

১৯৭৯ সালে ধর্মতত্ত্ব বিভাগ দিয়ে শুরু হলেও আজ ইবি একটি বিস্তৃত একাডেমিক পরিসর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তবুও আবাসন সংকট, হলে নিম্নমানের খাবার, শিক্ষক সংকট ও সেশনজট বিশ্ববিদ্যালয়কে পিছিয়ে দিচ্ছে।
আশা: নতুন আবাসিক ভবন নির্মাণসহ ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো ইবিকে একদিন শীর্ষস্থানে পৌঁছে দেবে।
— হোসনেয়ারা খাতুন, আরবি বিভাগ

আবাসন সংকট ও নিরাপত্তা—সময়ের দাবি

শিক্ষার্থীদের জন্য নির্মাণাধীন হলগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করা জরুরি। ক্যাম্পাসে ফাঁকা জায়গাগুলো গবেষণা, পাঠচর্চা ও বিনোদনের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।
বিশেষ করে সন্ধ্যার পর নিরাপত্তা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।
প্রত্যাশা: ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
— জিন্নাতুর রহমান, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ

ইলেকট্রনিক ব্যাংকিং ও আধুনিক গবেষণা সুবিধার দাবি

স্বাধীনতার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও ইবিতে এখনো ই–ব্যাংকিং ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হয়নি। অনেক বিভাগের ল্যাবে সরঞ্জাম সংকট, গবেষণায় অপর্যাপ্ত তহবিল এবং আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার সুযোগ সীমিত।
প্রত্যাশা: ই-সেবা ও গবেষণা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে আধুনিকায়ন করা।
— ছাব্বির হুসাইন রিয়াদ, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ

ইসলামী ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয়ে এগিয়ে চলা ইবি

চার দশকের বেশি সময় ধরে ইবি আল-হাদিস, ফিকহ, দাওয়াহসহ ইসলামী জ্ঞানচর্চা এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও মানবিক বিদ্যার সমন্বয়ে এক সমৃদ্ধ পাঠপরিমণ্ডল গড়ে তুলেছে।
তবু আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা তহবিল, আধুনিক ল্যাব, গবেষণা অনুদান এবং শিল্প–বিশ্ববিদ্যালয় সংযোগকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
— খন্দকার আহনাফউজ্জামান, আল-হাদিস বিভাগ