মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হবে আজ সোমবার। গত বছরের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের অভিযোগে তারা অভিযুক্ত। মামলার অন্য দুই আসামি হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন। গ্রেপ্তার থাকা একমাত্র আসামি সাবেক আইজিপি মামুন ইতোমধ্যেই ‘অ্যাপ্রুভার’ বা রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন।
প্রসিকিউশন শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে। আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা খালাস চেয়েছেন। রাজসাক্ষী মামুনের খালাসও দাবি করা হয়েছে তাঁর আইনজীবীর পক্ষ থেকে। রায়কে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে। রাজনৈতিক অঙ্গনও চরম তৎপর। দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সমাজেরও নজর আজকের রায়ের দিকে।
পূর্বঘোষিত সময় অনুযায়ী সকাল ১১টায় বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ রায় ঘোষণা করবে। অন্যান্য সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম জানান, মামলার সবকিছু আদালতে প্রমাণিত হয়েছে বলে তারা মনে করেন। রায়টি বাংলাদেশ টেলিভিশন, দেশি-বিদেশি টিভি এবং ট্রাইব্যুনালের ফেসবুক পেজে সরাসরি সম্প্রচার হবে। রাজধানীর কয়েকটি স্থানে বড় পর্দার ব্যবস্থা রাখার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
রায় পরবর্তী পদক্ষেপ
রায় ঘোষণার পর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউটর তামিম। একই সঙ্গে আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা ভুক্তভোগী পরিবারের মধ্যে বিতরণ করার আবেদনও করা হয়েছে।
টানটান উত্তেজনা রাজনৈতিক অঙ্গনে
নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ১৬ ও ১৭ নভেম্বর ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে। এ কারণে কয়েকটি জেলায় র্যাব-পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট এলাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেনা মোতায়েনের অনুরোধও পাঠিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
রায়ের আগের দিন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বচ্ছতা ও পূর্ণ ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, রায় কার্যকর করতে সরকার সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে।
কোন অভিযোগে বিচার
শেখ হাসিনা ও দুই সহআসামির বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এগুলো হলো:
১৪ জুলাই গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে উসকানিমূলক বক্তব্য এবং এর পর ছাত্র-জনতার ওপর সমন্বিত হামলা।
হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূলের নির্দেশ।
রংপুরে আবু সাঈদকে কাছ থেকে গুলি করে হত্যা।
৫ আগস্ট চানখাঁরপুলে ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা।
আশুলিয়ায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যা এবং পাঁচজনের মরদেহসহ এক আহত ছাত্রকে পুড়িয়ে দেওয়া।
প্রতিটি অভিযোগেই নির্দেশ, উসকানি, ষড়যন্ত্র, সহায়তা এবং অপরাধ প্রতিরোধে ব্যর্থতার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
মামলার পটভূমি
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে দেড় হাজারের মতো মানুষ নিহত হয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে গণহত্যার বিচার শুরু করে। প্রথম মামলাটি হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। পরে আরও দুইজনকে যুক্ত করা হয়।
মামলায় ৫৪ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের বক্তব্যে গণহত্যা, গুম-খুনসহ নানা নৃশংসতার চিত্র উঠে এসেছে। ১২ অক্টোবর যুক্তিতর্ক শুরু হয়ে শেষ হয় ২৩ অক্টোবর। চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন। আসামিপক্ষ খালাস চায়।





