রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মা ও মেয়েকে হত্যার ঘটনায় গৃহকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। নিহত লায়লা ফিরোজের স্বামী আ জ ম আজিজুল ইসলাম সোমবার রাত ১০টায় মোহাম্মদপুর থানায় এ হত্যা মামলা করেন বলে ওসি মেজবাহ উদ্দিন জানান। সোমবার শাহজাহান রোডের ওই বাসায় ৪৮ বছর বয়সী লায়লা আফরোজ এবং তার ১৫ বছর বয়সী মেয়ে নাফিসা লাওয়াল বিনতে আজিজকে গলা কেটে খুন করা হয়।


ওসি বলেন, “মামলায় গৃহকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। ওই গৃহকর্মী হত্যার সাথে জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। গৃহকর্মীর নাম আয়েশা বলে জানা গেলেও সেটা তার প্রকৃত নাম কিনা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।\"

আসামিকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে শিগগিরই ‘নতুন তথ্য’ দেওয়া যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

মামলার বাদী আজিজুল ইসলাম উত্তরার সানবিমস স্কুলের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক। স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাকে নিয়ে মোহাম্মদপুরের ওই বাসায় প্রায় ১৩ বছর ধরে বসবাস করে আসছিলেন তিনি। তাদের গ্রামের বাড়ি নাটোরে।


প্রতিদিনের মতো সোমবার সকাল ৭টার দিকে স্কুলের উদ্দেশে বাসা থেকে বেরিয়ে যান আজিজুল। স্কুলে পরীক্ষা চলমান থাকায় বাসায় ফেরেন তাড়াতাড়ি।

বেলা ১১টার দিকে ফিরে বাসার এসেই তিনি স্ত্রী-কন্যার লাশ দেখতে পান। পরে তার চিৎকারে আশেপাশের বাসিন্দারা বেরিয়ে আসেন, খবর দেওয়া হয় পুলিশে।

ভবনের একাধিক সিসিটিভি ভিডিও বিশ্লেষণ করে পুলিশ বলে, সকাল ৭টা ৫১ মিনিটে বোরখা পরে ওই বাসায় ঢোকেন আনুমানিক ২০ বছর বয়সী আয়েশা। আর ৯টা ৩৬ মিনিটে স্কুলড্রেস পরে নির্বিঘ্নে বাসা থেকে বেরিয়ে যান। ওই স্কুলড্রেসটি ছিল খুন হওয়া নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাফিসার।

ওই বাসা থেকে পুলিশ দুটি ধারালো ছুরি উদ্ধার করেছে। হত্যাকারী ঘটনার পর বাসার বাথরুম ব্যবহার করেছেন, এমন আলামত পাওয়ার কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ কমিশনার ইবনে মিজান সোমবার বলেছিলেন, ঘটনার আগে-পরে ওই বাসায় কেবল গৃহকর্মীকেই আসা যাওয়া করতে দেখা গেছে।

“পরে দেখব আশেপাশে আরও কেউ ছিল কি না। পরে জানতে পারব তার সাথে আশেপাশে কেউ ছিল কি না।”

সোমবার ওই বাসায় গিয়ে লিফটের সামনে থেকে বাসার দরজা পর্যন্ত ছোপ ছোপ রক্তের দাগ দেখা যায়। আসবাবপত্র ছিল এলোমেলো অবস্থায়।

পুলিশ বলছে, বাসায় ধস্তাধস্তির আলামত পাওয়া গেছে, মেঝের পাশাপাশি দেয়ালেও রক্তের দাগ ছিল। আলমারি ও ভ্যানিটি ব্যাগ তছনছ করা হয়েছে। এ থেকে ধারণা হয়, বাসা থেকে কিছু খোয়া যেতে পারে।

গৃহকর্তা আজিজুল বলেছেন, বাসায় এসে প্রথমে দরজায় নক করে তিনি কোনো সাড়াশব্দ পাননি। এরপর দেখতে পান দরজা খোলা। ড্রইং রুমে তিনি মেয়ে নাফিসার রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। পাশের রুমে একটু দূরে স্ত্রীর রক্তাক্ত দেহ দেখতে পান।

বেঁচে থাকতে পারে ধারণা করে অন্যান্য প্রতিবেশীদের সহায়তায় মেয়েকে হাসপাতালে পাঠিয়েছিলেন আজিজুল, সেখানে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। আর পুলিশ এসে ঘটনাস্থল থেকে লায়লা আফরোজের লাশ উদ্ধার করে।

আজিজুল বলেন, “আমাদের একজন কাজের মহিলার দরকার ছিল। সাধারণত গেটে অনেকেই কাজের সন্ধানে আসেন। আমরা দারোয়ানকে এমন কেউ আসলে জানানোর কথা বলে রেখেছিলাম।

“চিার দিন আগে একটি মেয়ে কাজের সন্ধানে আসে। বোরকা পরিহিত অবস্থায় ওই মেয়েটি এলে দারোয়ান তাকে আমাদের বাসায় পাঠিয়ে দেয়৷ এরপর আমার স্ত্রী মেয়েটির সঙ্গে কথা বলে কাজে রেখে দেয়। পরে আমি স্ত্রীর মুখে শুনেছি, মেয়েটার নাম আয়েশা।”

আয়েশা তাদেরকে বলেছেন, তার গ্রামের বাড়ি রংপুর, জেনিভা ক্যাম্পে চাচা-চাচির সঙ্গে থাকেন। বাবা-মা আগুনে পুড়ে মারা গেছেন, তার শরীরেও আগুনে পোড়ার ক্ষত রয়েছে।

স্থায়ী গৃহকর্মী না হওয়ায় তার কোনো কাগজপত্র রাখা হয়নি বলে আজিজুল পুলিশকে জানিয়েছেন।

ঘটনার পর দারোয়ান খালেককে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। তিনি পুলিশকে বলেছেন, চার দিন আগে বাসায় কাজের জন্য আসায় তরুণীকে ওই ফ্ল্যাটে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ওই তরুণী তার পূর্বপরিচিত নন।

ভিডিও ও দারোয়ানকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ বলছে, সোমবার সকাল ৭টার পর আয়েশা যখন আসে, স্বাভাবিকভাবেই বাসার নিরাপত্তাকর্মী খালেক তাকে ভেতরে যেতে দেন। কিন্তু বের হওয়ার সময় স্কুলড্রেস পরে যাওয়ার সময় তার মুখে মাস্ক থাকায় গেটে দায়িত্বরত থাকা খালেক চিনতে পারেননি।

গেট থেকে বের হওয়ার পর ডেকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি সপ্তম তলার ‘৭বি’ ফ্ল্যাটে থাকেন বলে চলে যান। সেটি আজিজুলেরই ফ্ল্যাটের নম্বর, সেখানেই গৃহকর্মীর কাজ নিয়েছিলেন আয়েশা।