বাংলাদেশে ভারতের আধিপত্যবাদ ও একপক্ষীয় নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া অন্তত ৫০ জন রাজনৈতিক নেতা, ছাত্রনেতা, বুদ্ধিজীবী ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বর্তমানে ‘উচ্চ ঝুঁকিতে’ রয়েছেন বলে নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তাদের নিরাপত্তা নিয়ে সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশেষ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত বছরের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর যারা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং জনগণের অধিকার নিয়ে আপসহীন অবস্থান নিয়েছেন, তারাই একটি পরিকল্পিত টার্গেটিংয়ের মুখে পড়ছেন। বিশেষ করে ভারতের প্রভাবমুক্ত নীতির পক্ষে রাজপথে ও লেখালেখিতে সোচ্চার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দমনমূলক তৎপরতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
সম্প্রতি ইনকিলাব মঞ্চের সংগঠক শরীফ ওসমান হাদির ওপর প্রকাশ্য দিবালোকে হামলার ঘটনায় এই আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং আধিপত্যবাদবিরোধী কণ্ঠগুলোকে ভয় দেখানো ও স্তব্ধ করার একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এই টার্গেটিংয়ের ক্ষেত্রে সরাসরি রাষ্ট্রীয় বাহিনী নয়; বরং ‘ছায়া সংগঠন’, ভাড়াটে সন্ত্রাসী ও ডিজিটাল ট্রল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ‘উগ্রবাদী’ বা ‘ভারতবিদ্বেষী’ হিসেবে উপস্থাপন করে জনবিচ্ছিন্ন করা হয়। এরপর নজরদারি বাড়িয়ে সুযোগ বুঝে শারীরিক হামলা, হুমকি কিংবা ডিজিটাল হয়রানির মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা চলে।
কারা আছেন উচ্চ ঝুঁকিতে
নিরাপত্তা বিবেচনায় তৈরি তালিকার শীর্ষে রয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, এবি পার্টির শীর্ষ নেতা ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ ও মুজিবুর রহমান মঞ্জু, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, ছাত্রনেতা হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলমসহ আরও অনেকে রয়েছেন।
তালিকায় আছেন গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নূর ও রাশেদ খান, হেফাজতে ইসলামের মামুনুল হক, ইসলামী আন্দোলনের মুফতি রেজাউল করীম, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের শীর্ষ নেতা এবং সীমান্ত ও ক্যাম্পাসভিত্তিক আন্দোলনের মুখগুলোও।
বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের চলাচলে সশস্ত্র এসকর্ট, সাদা পোশাকের নিরাপত্তা সদস্য এবং প্রয়োজনে ‘সেফ হাউস’ ব্যবস্থার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। জনসভা বা সফরের আগে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
ডিজিটাল হুমকি ও নজরদারি
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু গ্রুপ ও নামহীন পেজ থেকে নিয়মিতভাবে এসব ব্যক্তির ছবি, ব্যক্তিগত তথ্য ও অবস্থান ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। একে ‘ডিজিটাল হিটলিস্ট’ আখ্যা দিয়ে তারা বলছেন, এটি একটি পরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যার লক্ষ্য ভয় সৃষ্টি করে সমালোচকদের চুপ করানো।
নিরাপত্তা মহলের সতর্কতা
নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সমমর্যাদাভিত্তিক হওয়া জরুরি। এই দাবি তোলাকে ‘বিদ্বেষ’ বলে দমনের চেষ্টা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের মতে, ঝুঁকিতে থাকা কণ্ঠগুলোকে সুরক্ষা না দিলে রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক শক্তি ও নৈতিক অবস্থান হারাবে।
এই পরিস্থিতিতে স্বচ্ছ তদন্ত, ডিজিটাল অধিকার সুরক্ষা এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।





