নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বলেন, জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে নির্বাচনব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত সংস্কার আনা হয়নি। রাজধানীতে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে তিনি জানান, ৪৬ হাজার মানুষের ওপর পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে, বেশিরভাগ নাগরিক জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চায়। তবে কমিশনের এই পরামর্শ কার্যত উপেক্ষিত থেকে গেছে, পুরোনো কাঠামোই টিকিয়ে রাখা হয়েছে।
ড. মজুমদার বলেন, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি একটি বিস্তৃত সংস্কারপ্রস্তাবনা তুলে ধরে। এই প্রস্তাবে ১৬টি ক্ষেত্রে মোট ১৫০টি সুপারিশ করা হয়। এসব সুপারিশ প্রণয়ন করা হয় প্রচলিত আইন, বিধি-বিধান পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বিস্তৃত মতবিনিময়ের ভিত্তিতে। কমিশনের মতে, সুপারিশগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল নির্বাচনব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, গণতান্ত্রিক এবং অংশগ্রহণমূলক করে তোলা।
সুপারিশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের আগে আয়োজন করা এবং এর জন্য একটি স্থায়ী ‘স্থানীয় সরকার কমিশন’ গঠন করা। এছাড়া নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়েও সুপারিশ আসে—যাতে রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে যোগ্য ও সুনামসম্পন্ন ব্যক্তিদের নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। একটি বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে একটি স্থায়ী ‘জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল’ গঠনের কথাও বলা হয়, যা সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহে নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা করবে; যদিও এটি বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে।
নির্বাচন পদ্ধতিতে ব্যাপক সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়, যার মধ্যে রয়েছে ইভিএম ব্যবহারের বিধান বাতিল করা, কোনও আসনে মোট ভোটারের ৪০ শতাংশ ভোট না পড়লে পুনঃনির্বাচনের ব্যবস্থা, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন বন্ধ করা এবং ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী না থাকলে ‘না ভোট’ দেওয়ার সুযোগ চালু করা। এমনকি ‘না ভোট’ যদি জয়ী হয়, তবে নির্বাচন বাতিল করার পাশাপাশি ওই নির্বাচনের প্রার্থীদের পরবর্তী পুনঃনির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করারও সুপারিশ করা হয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতিতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। দলনিরপেক্ষ, সৎ এবং যোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করার পাশাপাশি জাতীয় সংসদের উভয় কক্ষের সদস্য এবং স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বড় পরিসরের নির্বাচকমণ্ডলীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় কমিশন সুপারিশ করে যে, কেউ যেন সর্বোচ্চ দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হতে পারে। সেইসঙ্গে দুইবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না এবং কেউ যেন একসঙ্গে দলপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা না হন, তা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
সংসদের কাঠামোতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব আছে। একটি উচ্চকক্ষ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে, যেখানে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন। এদের মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি বিশিষ্টজনদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এছাড়া নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ নারী সদস্য রাখার কথা বলা হয়েছে। বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকারের পদ দেওয়ার বিষয়টিও প্রস্তাবনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত সুপারিশগুলোর একটি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা। এতে চার মাস মেয়াদি একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছে, যার অধীনে জাতীয় ও স্থানীয় সব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই সরকারের দায়িত্ব শুধু রুটিন কাজ নয়, বরং সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইন সংস্কার এবং প্রশাসনিক রদবদল করাও এর আওতায় পড়বে। সরকারের প্রধান ও উপদেষ্টাদের নিয়োগ দেবে একটি জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল।
রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন সংক্রান্ত সুপারিশগুলোতেও বেশ কিছু পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। নতুন দল নিবন্ধনের জন্য শর্ত শিথিল করার পাশাপাশি প্রতিটি দলের জন্য প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নিবন্ধন নবায়ন বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। ছাত্র, শিক্ষক বা শ্রমিক সংগঠন—যা মূল দলের লেজুড় হিসেবে কাজ করে—এমন কোনো সংগঠন না রাখার শর্তও সুপারিশে রয়েছে। পাশাপাশি পরপর দুটি নির্বাচনে অংশ না নিলে দলের নিবন্ধন বাতিলের নিয়ম তুলে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসীদের ভোটাধিকারের বিষয়েও কমিশন প্রস্তাব দেয়। প্রবাসী ভোটারদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই ব্যবস্থার জন্য একটি ভোটার অ্যাপ ও একটি ভেরিফায়ার অ্যাপ ডেভেলপ করে নিরাপদ ও কার্যকরভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করার কথা বলা হয়।
ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে, যা ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত জরুরি। তবে তিনি হতাশার সুরে বলেন, এই প্রস্তাবনাগুলো এখনো যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না, যা গণতন্ত্রের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।





