নতুন বাহিনী গঠনের মাধ্যমে দেশের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। \"এয়ার গার্ড অব বাংলাদেশ (এজিবি)\" নামে একটি বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের প্রস্তাব নিয়ে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে ১২ সদস্যের একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব। কমিটি গত ৩১ আগস্ট থেকে কাজ শুরু করেছে এবং বাহিনী গঠনে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯৭ কোটি টাকা।
সরকারি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রথমে এ বাহিনী গঠনের প্রস্তাব আসে। এর যৌক্তিকতা যাচাই করতে গঠিত হয় আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি। এই কমিটিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন, অর্থ, প্রতিরক্ষা, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন শাখার প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি জানান, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (ICAO)-র নির্দেশনার আলোকে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এয়ার গার্ড গঠন সময়োপযোগী পদক্ষেপ। প্রথমে এটি বাহিনী হিসেবে কাজ শুরু করলেও পরবর্তীতে অধিদপ্তরে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে দেশের বিমানবন্দরগুলোর ভেতরে নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে বিমানবাহিনী, আর বাইরের নিরাপত্তা দেখে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। এছাড়া, এভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) বাহিনী যাত্রী ও লাগেজ স্ক্রিনিং, বিস্ফোরক শনাক্তকরণ, টহল ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে, দিন দিন অপরাধের মাত্রা বাড়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। স্বর্ণ ও বৈদেশিক মুদ্রা চোরাচালান, মানব পাচার, যাত্রী হয়রানি ও লাগেজ চুরি এখন সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিরো টলারেন্স নীতির পরও কার্যত অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এপিবিএন ও আনসারের ৯০২ সদস্য দায়িত্ব থেকে সরে গেলে ছয় ঘণ্টা ধরে বিমান ওঠানামা বন্ধ থাকে। বিমানবাহিনী তখন জরুরি ভিত্তিতে নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয়। এরপর থেকে বেবিচকের এভসেক বাহিনীর সঙ্গে বিমানবাহিনী যৌথভাবে কাজ করছে।
তবে এতে এপিবিএন ও বিমানবাহিনীর মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়। এপিবিএনের কমান্ড সেন্টার দখল, গুরুত্বপূর্ণ নথি হারানোর অভিযোগ এবং পাল্টাপাল্টি বিবৃতির মাধ্যমে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। এতে সরকারপক্ষও বিব্রত হয়।
বেবিচক সূত্র জানায়, তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বর্তমানে এভসেক বাহিনীতে সাড়ে তিন হাজার জনবল এবং মোট পাঁচ হাজারের বেশি কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন বাহিনী গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়হীনতা দূর করে একটি একক, দক্ষ ও পেশাদার বাহিনী গঠন করলে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাহিনীগুলোর মধ্যকার বিদ্যমান দ্বন্দ্ব সমাধান করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এয়ার গার্ড অব বাংলাদেশের প্রস্তাবিত গঠন ও কাঠামো এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বাস্তবায়ন হলে এটি দেশের বিমান চলাচলের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সুনাম রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।





