জয়পুরহাট প্রতিনিধি:জয়পুরহাট–২ সংসদীয় আসনটি জেলার কালাই, ক্ষেতলাল ও আক্কেলপুর—এই তিনটি উপজেলা নিয়ে গঠিত। রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি একাধিকবার এই আসনে বিজয় অর্জন করেছে।
সম্প্রতি বিএনপির মনোনয়ন ঘিরে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দেখা দিলেও এখন তা নিরসন হয়েছে। মাঠপর্যায়ে একযোগে কাজ করছেন দলটির নেতা–কর্মীরা। অপরদিকে, জামায়াতে ইসলামী একক প্রার্থী দেওয়ায় শুরু থেকেই দলটির নেতাকর্মীরা মাঠে সক্রিয় এবং সংগঠিত প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
এই আসনে প্রাথমিকভাবে তিনজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন। তারা হলেন— বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মো. আব্দুল বারী, জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী এস এম রাশেদুল আলম সবুজ এবং এবি পার্টি মনোনীত প্রার্থী এস এ জাহিদ।
তবে গত শনিবার ১১ দলীয় জোটের এক জনসভায় এবি পার্টির প্রার্থী এস এ জাহিদ প্রকাশ্যে জামায়াত প্রার্থী এস এম রাশেদুল আলম সবুজকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। ফলে জয়পুরহাট–২ আসনে এখন সরাসরি দুই প্রার্থীর লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে নির্বাচন। এতে করে পুরো এলাকায় রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বেড়েছে।
এদিকে আসনটি ধরে রাখতে বিএনপি কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করেছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, উঠান বৈঠক ও মতবিনিময় সভা বাড়ানো হয়েছে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীও এই আসন দখলের লক্ষ্য নিয়ে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক সাংগঠনিক বৈঠক, গণসংযোগ ও প্রচার কার্যক্রম জোরদার করেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, জয়পুরহাট–২ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫১ হাজার ৫৭২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৪ হাজার ১৭৭ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৭৭ হাজার ৩৯৩ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ২ জন।
পুরুষ ভোটারের তুলনায় নারী ভোটার সংখ্যা বেশি হওয়ায় এবারের নির্বাচনে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ আসনে ভোটকেন্দ্রের স্থায়ী সংখ্যা ১০৪টি। মোট ভোটকক্ষ রয়েছে ৭১০টি, যার মধ্যে ৬৭৫টি স্থায়ী এবং ৩৫টি অস্থায়ী। নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সৎ নেতৃত্ব, নিরাপত্তা, দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন—এসব বিষয়ই এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। কৃষিনির্ভর এই এলাকায় বিশেষ করে সেচব্যবস্থা ও ফসলের বাজারজাতকরণ নিয়ে ভোটারদের প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি।
কালাই উপজেলার জমিনপুর গ্রামের কৃষক ভোটার সবুজ আকন্দ বলেন,
“আমরা রাজনীতি বুঝি কম, কিন্তু সৎ মানুষ চাই—যে ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে কাজ করবে। ফসলের ন্যায্য দাম আর সারের সমস্যা ঠিক হলে আমাদের সবচেয়ে উপকার হবে।”
ক্ষেতলাল উপজেলার বড়তারা গ্রামের নারী ভোটার জাকিয়া আক্তার বলেন,
“ভোট দিতে চাই নিরাপদ পরিবেশে। আমাদের এলাকার রাস্তাঘাট, হাসপাতাল আর মেয়েদের কাজের সুযোগ বাড়াতে হবে। যে প্রার্থী এসব করবে, তাকেই ভোট দেব।”
আক্কেলপুর উপজেলার বিহারপুর গ্রামের তরুণ ভোটার সবুজ মন্ডল বলেন, “পড়ালেখা শেষ করেও চাকরি নেই। চাই দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র, যেখানে মানুষ থাকবে নিরাপদ। শুধু প্রতিশ্রুতি নয়—বাস্তবে কর্মসংস্থান আর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা দরকার। এবার আমরা পরিবর্তন দেখতে চাই।”
বিএনপির প্রার্থী মো. আব্দুল বারী বলেন, জয়পুরহাট–২ আসনের মানুষের সুখ–দুঃখ, চাহিদা ও সংগ্রামের সঙ্গে বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। তিনি নির্বাচিত হলে কৃষকদের জন্য সারের ন্যায্যমূল্য ও ফসলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, উন্নত সড়ক যোগাযোগ ও বাজার অবকাঠামো গড়ে তোলা, যুব সমাজের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সরকারি হাসপাতাল ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেবার মান উন্নয়ন এবং সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বন্ধের অঙ্গীকার করেন।
তিনি আরও বলেন, “জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে কালাই, ক্ষেতলাল ও আক্কেলপুরকে একটি উন্নত জনপদে রূপান্তরিত করব।”
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এস এম রাশেদুল আলম সবুজ বলেন,
এই আসনের মানুষ দুর্নীতিমুক্ত, সৎ ও ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক নেতৃত্ব চায়। তিনি নির্বাচিত হলে দুর্নীতি ও দলীয় প্রভাবমুক্ত স্থানীয় প্রশাসন গড়ে তোলা, কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে নৈতিকতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, নারী ভোটারদের জন্য নিরাপত্তা ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, মাদক ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা এবং জনপ্রতিনিধিকে নিয়মিত জনগণের জবাবদিহির আওতায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি বলেন, “ক্ষমতা নয়, জনগণের আমানত রক্ষা করাই আমাদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য।”
সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণ, এবি পার্টির প্রার্থী সরে দাঁড়ানো, নারী ও তরুণ ভোটারদের বাড়তি গুরুত্ব এবং উন্নয়ন ও সুশাসনকেন্দ্রিক প্রত্যাশা—সবকিছু মিলিয়ে জয়পুরহাট–২ আসনের ফল নির্ধারণ করবে।





