জাপান বাংলাদেশের সঙ্গে একটি বিশেষায়িত প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। চলতি বছরের মধ্যেই এ চুক্তি সইয়ের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, চুক্তি কার্যকর হলে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যৌথ গবেষণার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নতুন মাত্রা পাবে।


২০২৪ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস টোকিও সফরে গিয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। বৈঠকের ধারাবাহিকতায় দুই দেশ নীতিগতভাবে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সমরাস্ত্র বিনিময়সংক্রান্ত একটি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।


এর আগে, ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে দুই দেশ একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা–সংক্রান্ত সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করে। তখন থেকেই বিস্তারিত চুক্তির প্রস্তুতি চলছিল।

জাপানের প্রতিরক্ষা নীতির ভিত্তিতে প্রস্তাবিত এই চুক্তিটি তিনটি মূল দিককে গুরুত্ব দিচ্ছে:

প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম হস্তান্তর – নৌ টহলযান, যোগাযোগব্যবস্থা, নজরদারি প্রযুক্তি এবং অপ্রাণঘাতী সামরিক সরঞ্জাম।

যৌথ গবেষণা – সাইবার নিরাপত্তা, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও উপকূলীয় নজরদারির মতো খাতে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা।

কঠোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা – সরবরাহকৃত সমরাস্ত্র অন্য কোনো দেশে হস্তান্তর করা যাবে না এবং এর ব্যবহার নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ সমুদ্র ও সাইবার নিরাপত্তায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পাবে, যা সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াবে।


তবে ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশ বহুদিন ধরেই চীনের কাছ থেকে সমরাস্ত্র সংগ্রহ করে আসছে। জাপানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক চীনের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে। তাই বাংলাদেশকে বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করে এগোতে হবে।


জাপান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানিতে তাদের নীতি শিথিল করেছে এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাজার খুঁজছে। ঢাকায় নিযুক্ত জাপানি রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি ২০২২ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছে। সে সময় মিৎসুবিশি ইলেকট্রনিকসের একটি প্রতিনিধি দল বিমানবাহিনীর রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে ঢাকায় এসেছিল।


সূত্র জানায়, জাপান প্রয়োজন হলে আর্থিক সহায়তার ভিত্তিতেও সমরাস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব বিবেচনা করছে। শেখ হাসিনার পূর্বনির্ধারিত টোকিও সফরের প্রস্তুতিকালে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল, যদিও সফরটি পরবর্তীতে স্থগিত হয়।


বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিআইপিএসএস)-এর প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ. ন. ম. মুনীরুজ্জামান মনে করেন, “এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু সমরাস্ত্রই নয়, প্রযুক্তিগত সহায়তাও পাবে, যা সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যেহেতু এতে কোনো বাধ্যতামূলক রাজনৈতিক শর্ত নেই, তাই এটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে লাভজনক।”


২০১৩ সালে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে জাপান এই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নীতি শুরু করে। এখন পর্যন্ত তারা ভারত, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও মঙ্গোলিয়াসহ ১২টি দেশের সঙ্গে এমন চুক্তি করেছে।


বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত ১১টি দেশের সঙ্গে ২০টি প্রতিরক্ষা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মালয়েশিয়ার সঙ্গে একটি এমওইউ সই হয়।


সব মিলিয়ে, প্রস্তাবিত বাংলাদেশ–জাপান প্রতিরক্ষা চুক্তি একদিকে প্রযুক্তিনির্ভর সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার সুযোগ এনে দেবে, অন্যদিকে কৌশলগত প্রতিযোগিতার মাঝে ভারসাম্য রক্ষার নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। তবুও, কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কূটনীতির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।