বরগুনা প্রতিনিধি :  একসময় যে গ্রাম পরিচিত ছিল সবুজ শিমের রাজ্য হিসেবে, আজ সেখানে শুধুই হলুদ পাতার দীর্ঘশ্বাস। বরগুনার তালতলী উপজেলার বড়বগী ইউনিয়নের সওদাগরপাড়া গ্রাম, যাকে সবাই চিনত ‘সবজি গ্রাম’ নামে, এখন যেন নিঃশব্দ বিপর্যয়ের প্রতীক।


মাঠজুড়ে সারি সারি শিম গাছ। কিন্তু গাছে নেই প্রাণের ছোঁয়া। পাতা, ফুল ও শিম সবই হলুদ হয়ে ঝুলে আছে। যে শিম একসময় বরিশালসহ আশপাশের কয়েকটি জেলার চাহিদা পূরণ করত, এ বছর তা বিক্রির অযোগ্য। পাইকার নেই, বাজার নেই, আছে শুধু দেনার হিসাব।



শিম খেতের পাশে দাঁড়িয়ে চোখের পানি লোকাতে লোকাতে হান্নান ফকির বলেন, ‘এ বছর এক লাখ টাকা খরচ করেছি। এখন ভাইরাসে সব শেষ। দেনা কীভাবে শোধ করব? মরণ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই আমাদের।’ শুধু হান্নান নন, এমন অবস্থায় পড়েছেন সওদাগরপাড়া গ্রামের অন্তত দুই শতাধিক কৃষক। কেউ ৮০ হাজার, কেউ দেড় লাখ, কেউ বা তারও বেশি টাকা বিনিয়োগ করে এখন সর্বস্বান্ত।


২২ একরের মধ্যে ২০ একর আক্রান্ত। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রায় দেড় দশক ধরে সমবায় পদ্ধতিতে সবজি চাষ করে আসছেন এই এলাকার কৃষকরা। শিমই ছিল তাদের প্রধান ফসল। প্রতি বছর ৬ থেকে ৭ কোটি টাকার শিম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হতো।


কিন্তু চলতি মৌসুমে প্রায় ২২ একর শিম চাষের জমির মধ্যে ২০ একরেই ভাইরাসের আক্রমণ হয়েছে। ফলে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৭ কোটি টাকা।


নিজ খরচে ওষুধ—সরকারি সহায়তা নেই। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মো. আরিফ বলেন, ‘পাতা হলুদ হতে শুরু করলে নিজেদের টাকায় সার, ওষুধ কিনে ব্যবহার করেছি। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। কৃষি অফিস থেকে কার্যকর সহযোগিতা পাইনি। উল্টো লাখ টাকার লোকসান গুনতে হবে।


একই অভিযোগ সেলিম ফকিরের কণ্ঠেও, ‘সরকারি সহায়তার কথা শুনেছি, কিন্তু বাস্তবে কিছু পাইনি। আমার জমিতে এক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এখন ১৫ হাজার টাকার শিম বিক্রি হবে কি না সন্দেহ।


সবজি গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা শাহাদাত মাতবর বলেন, ‘এত বড় ক্ষতির পরও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাত্র একবার এসে দেখে গেছেন। পরে আর কোনো খোঁজ নেই। দুই শতাধিক কৃষক পথে বসার উপক্রম।

বিষয়ে বরগুনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ভাইরাসের আক্রমণেই শিম গাছগুলো হলুদ হয়েছে। নমুনা সংগ্রহ করে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে।’


তিনি আরও বলেন, ‘একই জমিতে বারবার একই সবজি চাষ করলে ভাইরাসের ঝুঁকি বাড়ে। ফসল পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন করলে এই সমস্যা কমানো সম্ভব।’

প্রণোদনার বিষয়ে তিনি জানান, ‘প্রণোদনার পরিমাণ সীমিত হওয়ায় সব কৃষককে একসাথে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে সরকারিভাবে কিছু সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’

যে গ্রাম একসময় জেলার গর্ব ছিল, আজ সেখানে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ভাইরাসে শুধু শিম গাছই হলুদ হয়নি, হলুদ হয়ে গেছে কৃষকদের স্বপ্ন, আশা আর জীবন সংগ্রামের রং। এই সংকটে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আর্থিক সহায়তা ও টেকসই কৃষি পরিকল্পনা না এলে, ‘সবজি গ্রাম’ হয়তো অচিরেই পরিণত হবে আরেকটি হারিয়ে যাওয়া গল্পে।