দীর্ঘ ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), হল সংসদ এবং সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন। ১৫ সেপ্টেম্বর ভোটের তারিখ ঠিক করেছে রাকসুর নির্বাচন কমিশন। এদিনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে প্যানেল গোছাতে শুরু করেছে। সেই সঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন সাবেক সমন্বয়ক, ইসলামী ছাত্রশিবির, ছাত্র অধিকার পরিষদ, বামপন্থি ছাত্রসংগঠন, ইসলামী ছাত্রী সংস্থা, সাধারণ শিক্ষার্থী এবং সাংবাদিকদের আলাদা প্যানেল দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। তবে শাখা ছাত্রদলের দাবি-রাকসু নির্বাচনের জন্য তাদের আরও সময় প্রয়োজন। এছাড়া ফ্যাসিস্ট শিক্ষকদের বিচারের পরই তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে।
রাকসু নির্বাচনে প্যানেল এখনো সামনে না এলেও অনেক প্রার্থী গণসংযোগ শুরু করেছেন। ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ একাধিক ক্রিয়াশীল সংগঠন মিলিয়ে ৬ থেকে ৭টি প্যানেল থাকতে পারে বলে জানা যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তিন বছর পর প্রথম ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় ১৯৫৬-৫৭ বর্ষে। সেসময় এই সংসদের নাম ছিল ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (রাকসু)। ১৯৬২ সালে ‘কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ রাকসু’ নামে যাত্রা শুরু করে। এরপর ১৬ বার আয়োজন করা হয়েছে রাকসু নির্বাচন। সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৮৯ সালে।
সাবেক সমন্বয়কদের প্যানেল :
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রাবির কয়েকজন সমন্বয়ক মিলে একটি প্যানেলে রাকসু নির্বাচন করবে। সম্ভাব্য এই প্যানেলে সাবেক সমন্বয়ক মেহেদী সজীব ভিপি এবং জিএস পদপ্রার্থী ফাহিম রেজা, জিএস সাব্বিরসহ বেশ কয়েকজনের নাম শোনা যাচ্ছে। এছাড়াও এই প্যানেলে মিডিয়া সম্পাদক হিসাবে আসতে পারেন বিশ্ববিদ্যালয় স্টুডেন্টস রাইটস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফাহির আমিন, ক্রীড়া সম্পাদক পদে নির্বাচন করবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইয়াসিন আরাফাত বিজয়। তবে সমন্বয়করা বিভিন্ন ইস্যুতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আরেকটি আলাদা প্যানেল করে জিএস পদে নির্বাচন করতে পারেন সাবেক সমন্বয়ক সালাহউদ্দিন আম্মার।
ভিপি পদে প্রার্থিতার ঘোষণা দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক মেহেদী সজীব। তিনি বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের একটি অংশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন যারা বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের অধিকার ও দাবিদাওয়া নিয়ে কাজ করেছে, তাদের নিয়ে এই সপ্তাহের শেষে আমরা পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করব।’
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল :
শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, আমাদের আরও সময় প্রয়োজন। বিষয়টি আমরা মৌখিকভাবে প্রশাসনকে জানিয়েছি। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত না করে তড়িঘড়ি তফশিল ঘোষণা অগ্রহণযোগ্য। আস্থা ও পরিবেশ নিশ্চিত করে, যৌক্তিক দাবি ও প্রস্তাব মেনে তফশিল পুনর্ঘোষণা আহ্বান জানাচ্ছি। প্রশাসনের অপ্রস্তুত অবস্থায় শিবির ও তাদের ছোট টিমের চাপে তফশিল ঘোষণা দুঃখজনক।
ইসলামী ছাত্রশিবির :
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ ফয়সাল বলেন, আমাদের সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালাচ্ছেন। আমরাও ফিল্ড গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছি। প্যানেল সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি বলার এখনো সময় আসেনি। নির্বাচনের সময় কিছুটা ঘনিয়ে এলে ভোটের মাঠের চিত্র এবং পরিবেশ পরিস্থিতির আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ছাত্র অধিকার পরিষদ :
রাকসুর ভিপি ও জিএস পদে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী মারুফ এবং সাধারণ সম্পাদক আল শাহরিয়ার শুভ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। সংগঠনের সভাপতি মেহেদী মারুফ বলেন, ক্যাম্পাসে অনেক হেভিওয়েট প্রার্থীর সঙ্গে আমিও অংশগ্রহণ করব। রাকসুর ভিপি পদে নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পরিস্থিতি সাপেক্ষে অন্য সিদ্ধান্তও আসতে পারে। ছাত্র অধিকার পরিষদের সঙ্গে সমমনা কোনো সংগঠন চাইলে নির্বাচন করতে পারবে। এছাড়াও সাধারণ শিক্ষার্থীরা চাইলেও আমাদের সঙ্গে অংশ নিতে পারে।
বামপন্থি ছাত্র সংগঠন :
বিশ্ববিদ্যালয় সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ইউনিয়ন, চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদসহ বামপন্থি সংগঠনগুলোর মোর্চা গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট মিলিয়ে একটি প্যানেল করবে জানান কয়েকজন নেতা। এ বিষয়ে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, আমরা সংগঠনগুলোর বাইরেও বিভিন্ন অ্যাক্টিভিস্টদের সঙ্গে আলোচনা করছি। কয়েকজন আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্বাচনের জন্য সম্মত হয়েছে। রাকসু নির্বাচন ঘিরে আমাদের তিনটি দাবি রয়েছে, দাবিগুলো হচ্ছে-রাকসু নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র আবাসিক হলের বদলে একাডেমিক ভবনে স্থাপন; আবাসিক হলে কোরআন পোড়ানো, রেজিস্ট্রারের বাসায় হাতবোমা বিস্ফোরণ ও ছাত্রজোটের কর্মসূচিতে হামলার তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা; সাইবার বুলিং রোধে কার্যকর সেল গঠন এবং নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা। তিনি আরও বলেন, তবে নির্বাচনের ব্যাপারে আমাদের এখনো সন্দেহ রয়ে গেছে। কেননা রাকসুকেন্দ্রিক কোনো সংগঠনের কোনোরকম পরামর্শ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গ্রহণ করছে না।
সাংবাদিকদের প্যানেল :
রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন, সাধারণ শিক্ষার্থীর বাইরে স্বতন্ত্র প্যানেলে ক্যাম্পাস সাংবাদিকদেরও রাকসু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি মনির হোসেন মাহিন রাকসু এবং সংগঠনের ১নং সহসভাপতি সৈয়দ সাকিব সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের নিজেই বিষয়টি প্রকাশ করেছেন।
সাধারণ শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক মিলে একটি স্বতন্ত্র প্যানেল হতে পারে উল্লেখ করে প্রেস ক্লাবের সভাপতি মনির হোসেন মাহিন বলেন, ‘প্রেস ক্লাব থেকে আমরা প্যানেলের চিন্তা করছি। এটি প্রেস ক্লাব এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত প্যানেল হতে পারে। যেসব শিক্ষার্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না এবং ক্যাম্পাসে ভালো পরিচিতি আছে তারা চাইলে রাকসুতে প্রেস ক্লাবের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্বাচন করতে পারবে। এছাড়া রাকসুর পাশাপাশি হল সংসদেও আমাদের প্যানেল থেকে প্রার্থিতার বিষয়ে আলোচনা চলছে। প্যানেল চূড়ান্ত হলে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে।
সাধারণ শিক্ষার্থী প্যানেল :
এদিকে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সংগঠনের বাইরে সাধারণ শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের সম্মিলিত একটি প্যানেলের আলোচনা শোনা যাচ্ছে। এরই মধ্যে ‘রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ডেমোক্রেটিক ফোরাম’ (ইউএসডিএফ) এবং ‘রাবি রেনেসাঁ’ নামে দুটি অরাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন আত্মপ্রকাশ করেছে। এছাড়াও অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ প্যানেল থেকে স্বতন্ত্র নির্বাচন করার ঘোষণা দিচ্ছেন।
ইসলামী ছাত্রী সংস্থা :
রাকসু নির্বাচনে মেয়েদের ৬টি হলে আলাদা প্যানেলে নির্বাচনে নিতে যাচ্ছে তারা। এছাড়াও রাকসুতে নারীবিষয়ক সম্পাদক ও সহকারী সম্পাদক দুটি পদ রয়েছে, সেগুলোয়ও এই প্যানেল থেকে প্রার্থী হবে বলে জানায় একটি সূত্র।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনের তারিখ ঠিক করা হয়েছে ১৫ সেপ্টেম্বর। এ তারিখকে কেন্দ্র করে নির্বাচনি প্রস্তুতি চলছে। কোনো সংগঠন আমাদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন পেছানোর দাবি করেনি। তাছাড়া নির্বাচন পেছানো নিয়ে কোনো আলোচনা আমাদের কমিশনে হয়নি। নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কেউ পাবে না। আশা করছি, আমরা সুন্দরভাবেই নির্বাচন পরিচালনা করতে পারব।’
রাকসুর তফশিল অনুযায়ী, প্রকাশিত খসড়া ভোটার তালিকায় নিষ্পত্তি ১০ থেকে ১২ আগস্ট এবং চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে ১৪ আগস্ট। তফশিল বিবরণীতে বলা হয়, মনোনয়নপত্র বিতরণ করা হবে ১৭ থেকে ১৯ আগস্ট; মনোনয়নপত্র দাখিল করা যাবে ২১, ২৪ ও ২৫ আগস্ট; মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ২৭ ও ২৮ আগস্ট; প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ ৩১ আগস্ট এবং মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময় ২ সেপ্টেম্বর। এছাড়া প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে ৪ সেপ্টেম্বর, ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত প্রতিটি আবাসিক হলে ভোটগ্রহণ, অর্থাৎ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং ওইদিনই ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণা করা হবে।
সূত্র: যুগান্তর





