ফেনী প্রতিনিধি : ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী দাদনা খাল বর্তমানে দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার কারণে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। দুই পাড়জুড়ে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থায়ী স্থাপনা, বাজার ও আবাসিক এলাকার বর্জ্য ফেলাসহ কচুরিপানায় খালটি দিনদিন ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বর্ষায় পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা হারিয়ে আশপাশের এলাকাগুলোতে বাড়ছে জলাবদ্ধতা।
জানা যায়, নোয়াখালীর কবিরহাট পয়েন্টে ছোট ফেনী নদীর সঙ্গমস্থল থেকে উৎপত্তি হওয়া দাদনার খালটি দীর্ঘ আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট ও সেনবাগের সীমানা ঘেঁষে দাগনভূঞায় প্রবেশ করেছে। একসময় এই খাল থেকেই আশপাশের কৃষকরা সেচ নিতেন।
কিন্তু দীর্ঘদিন খাল খনন না হওয়া, অবৈধ দখল এবং বিভিন্ন স্থানে বাঁধ তৈরির ফলে ছোট ফেনী নদীর জোয়ারের পানি এখন খালে ঢুকতে পারে না। ফলে দাদনার খাল কার্যত মৃতপ্রায়। এতে খালের দু’পাড়ের প্রায় ৩০ গ্রামের মানুষ ভোগান্তির শিকার।
দাগনভূঞা অঞ্চলে প্রায় ১৯ কিলোমিটার দীর্ঘ দাদনার খালের বড় অংশই দখলের কবলে। ৬৫ ফুট প্রশস্ত খাল এখন কোথাও ১০ ফুট, কোথাও ১৫ ফুটে নেমে এসেছে। স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দ্বারা দীর্ঘদিন দখল চলে আসায় খালটি যেন ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, একসময় দাদনা খালে ছোট ফেনী নদীর জোয়ারের পানি বয়ে যেত। কিন্তু দীর্ঘদিন খাল খনন না হওয়া, অবৈধ দখল এবং বিভিন্ন জায়গায় নানা ধরনের বাঁধ সৃষ্টি হওয়ায় ছোট ফেনী নদীর জোয়ারের পানি এখন আর খালে প্রবেশ করতে পারছে না।
স্থানীয়রা জানান, খালের দুই পাড়ে দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ দখল চলছে। প্রশাসনের কার্যকর কোনো উদ্যোগ না থাকায় দখলদাররা ধীরে ধীরে খাল সংকুচিত করে ফেলেছে। বাজারের পশু জবাইয়ের বর্জ্য, ড্রেনের পানি ও প্লাস্টিক বর্জ্য সরাসরি খালে পড়ায় খালটি এখন দুর্গন্ধযুক্ত ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এতে মশা–মাছির বিস্তার এবং বিভিন্ন রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়ছে।
দাগনভূঞা পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থায়নে খালটির আংশিক সংস্কার করা হলেও টেকসই কোনো ব্যবস্থা না থাকায় কয়েক বছরের মধ্যেই খালটি আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এ বছর পৌরসভা ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে খাল থেকে আবর্জনা অপসারণ করলেও কয়েক দিনের মধ্যেই আবার বর্জ্যে ভরে যায় সেটি। দাগনভূঞা বাজার ও আশপাশের আবাসিক এলাকায় যথাযথ ড্রেনেজ ও ডাস্টবিন ব্যবস্থা না থাকায় সব চাপ গিয়ে পড়ে এই খালের ওপর।
বর্ষাকালে খালে পানি প্রবাহ না থাকায় শহরের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতা। এতে স্কুলকলেজগামী শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও পথচারীরা প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হন।
দাগনভূঞার বাসিন্দারা বলছেন, প্রতিবছর সংবাদ প্রকাশ ও অভিযোগ জানানো হলেও কোনো স্থায়ী উদ্যোগ নেয়া হয় না। দাদনার খাল পুনরুদ্ধারের জন্য জরুরি ভিত্তিতে দখল উচ্ছেদ, নিয়মিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থার দাবি জানান তারা।
দাগনভূঞা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কাজী ইফতেখার বলেন, নিউজ ও মানববন্ধন করতে করতে সবাই ক্লান্ত। ছোট ফেনী নদীর সঙ্গে দাদনার খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ পুনঃসংযোগ এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে দিতে পারলেই খালটি আবার প্রাণ ফিরে পাবে।
দাগনভূঞা পৌরসভার সাবেক প্যানেল মেয়র কামাল হোসেন বলেন, দাদনা খাল দাগনভূঞা পৌরসভার প্রাণ। এই খালকে রক্ষা করতে হলে খনন, দখলমুক্তকরণ এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। বহু বছর ধরে প্রকল্পের কথা শোনা গেলেও এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। দ্রুত সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো উদ্যোগ নিলে দাগনভূঞার মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি লাঘব হবে।
দাগনভূঞা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা.এএসএম সোহরাব আল হোসাইন জানান, দাদনা খাল দূষিত হওয়ার কারণে এলাকায় মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে গেছে , ত্বকের সমস্যা, পানিবাহিত ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। দূষিত পানি ও দুর্গন্ধ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য ও নোংরা পানি জমে থাকায় পরিবেশ স্বাস্থ্যঝুঁকির পর্যায়ে চলে গেছে। খালটি দ্রুত বর্জ্যমুক্ত ও পানি প্রবাহ স্বাভাবিক না করলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
দাগনভূঞা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভা প্রশাসক মো. শাহীদুল ইসলাম জানান,
এখন পর্যন্ত দাদনা খাল খনন বা এ বিষয়ে কোনো চিঠি, বরাদ্দ বা প্রকল্প আমাদের কাছে আসেনি।খাল খননের দায়িত্ব সাধারণত পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিএডিসি বা সেচ বিভাগের মতো সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো নিয়ে থাকে। আমরা খালের দখল উচ্ছেদ ও সীমিত পরিসরে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে পারি, এর বাইরে বড় ধরনের কাজ করার সক্ষমতা আমাদের নেই। দাদনা খালের এলাকা অনেক বড়,এটি খনন না করলে পুরোপুরি পরিষ্কার হবে না। খনন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে কি না বা কোনো অনুমোদন হয়েছে কি না এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে কোনো তথ্য আসেনি।





