গত এক সপ্তাহে দেশজুড়ে পরপর তিনটি বড় অগ্নিকাণ্ড এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এসব ঘটনায় শুধু আর্থিক ক্ষতিই হয়নি, দেশের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনীতিক, উদ্যোক্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন—এগুলো নিছক দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত “আগুন রাজনীতি”? কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ভণ্ডুল করা ও পোশাক শিল্পে ধাক্কা দিতে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই এমন অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘটনায় নাশকতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না; প্রতিটি ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
গত মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরে একটি কেমিক্যাল গুদাম ও সংলগ্ন গার্মেন্টস কারখানায় ভয়াবহ আগুন লাগে। এতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়, শনাক্ত করা যায় ১০টি মরদেহ। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের সময় লেগে যায় ৭২ ঘণ্টারও বেশি। এই ঘটনার দুই দিন পর বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের কেপিআইভুক্ত এলাকায় আরেকটি অগ্নিকাণ্ডে ১৭ ঘণ্টা লড়াইয়ের পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে, কিন্তু ততক্ষণে পুরো ভবন পুড়ে যায়। এর ঠিক দুই দিন পর শনিবার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আবারও আগুন লাগে। আট ঘণ্টার প্রচেষ্টার পর আগুন নেভানো সম্ভব হলেও শত শত কোটি টাকার রপ্তানি পণ্য ছাই হয়ে যায়।
মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে তিনটি বড় অগ্নিকাণ্ডে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে—এই ঘটনাগুলো কি কেবল কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে কোনো পরিকল্পিত উদ্দেশ্য রয়েছে?
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান বলেছেন, সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড জননিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দাবি, জনগণ বিশ্বাস করে এসব ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত। সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রশ্ন তুলেছেন, বিমানবন্দরে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আটকে রাখা কি শুধু প্রশাসনিক জটিলতা, নাকি এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র? তিনি অভিযোগ করেন, একটি মহল দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে এবং এতে ভারত পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখতে পারে।
জামায়াতে ইসলামী আমির ডা. শফিকুর রহমানও বিমানবন্দর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বারবার আগুন লাগাকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি প্রশাসনিক গাফিলতি ও নিরাপত্তা ঘাটতির প্রশ্ন তুলেছেন এবং দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এনসিপি নেতা সারজিস আলম বলেছেন, এই আগুন লাগার ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং অস্থিতিশীলতা তৈরির ষড়যন্ত্রের অংশ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন মাহমুদ মনে করেন, এসব ঘটনায় নাশকতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। তাঁর মতে, আইনের দুর্বল প্রয়োগ ও জবাবদিহির অভাবই এমন পুনরাবৃত্তির বড় কারণ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মনিরুল ইসলাম আকন্দ বলেন, কেপিআই এলাকায় নাশকতা ঘটানো সহজ নয়। অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা ছাড়া এমন ঘটনা ঘটতে পারে না বলেই তাঁর ধারণা। তিনি মনে করেন, আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির কোনো প্রচেষ্টা আছে কি না, তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে।
ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক এ কে এম শাকিল নেওয়াজ বলেন, ইপিজেড ও বিমানবন্দরের মতো সংবেদনশীল স্থানে উন্নতমানের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকার কথা। তবুও কেন তা কার্যকর হলো না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। তিনি বলেন, সিস্টেমে কোথাও বড় ধরণের ঘাটতি বা বিলম্ব হয়েছে কি না, তা বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।
বন, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান, একের পর এক বড় অগ্নিকাণ্ডের প্রতিটি ঘটনারই সরকার তদন্ত করছে। বিমানবন্দরের অগ্নিকাণ্ডেরও স্বচ্ছ তদন্ত হবে, এবং রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পরপর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের এসব ঘটনায় নাশকতা, গাফিলতি ও নিরাপত্তা ঘাটতি—সবদিকই এখন আলোচনায়। জনগণ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দায় এড়িয়ে যাওয়া বা কাগুজে তদন্ত নয়, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা।





