সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর দেশে নারীদের ফাঁসি কার্যকরের ইতিহাস নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশে স্বাধীনতার পর থেকে শতাধিক নারী মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে কিন্তু একটিও কার্যকর হয়নি। এমনকি গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কারাগারেও নেই ফাঁসির মঞ্চ।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন বলেন, জামিনের ক্ষেত্রে নারী ও শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও রায় ঘোষণার ক্ষেত্রে আলাদা কোনো সুবিধা নেই। আইন অনুযায়ী নারী বা পুরুষ, আসামির পরিচয় নয়; অপরাধের প্রকৃতি এবং গুরুত্বই শাস্তি নির্ধারণ করে।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্কে সর্বোচ্চ শাস্তি চাওয়া হয়, আদালত সেই আবেদনের ভিত্তিতেই রায় দেন।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত কোনো নারী বন্দির ফাঁসি আজও কার্যকর হয়নি। কাশিমপুরের নারী কারাগারে ফাঁসির মঞ্চ না থাকার কারণও এটিই। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে তৎকালীন আইজি প্রিজন্স ব্রিগেডিয়ার জাকির হাসান জানিয়েছিলেন, ইতিহাসে কোনো নারীর ফাঁসি কার্যকর না হওয়ায় সেখানে মঞ্চ রাখা হয়নি।
বর্তমানে দেশে মোট ৯৪ জন নারী ফাঁসির কয়েদি আছেন। এর মধ্যে কাশিমপুর কারাগারে ৩৪ জন। শেখ হাসিনার রায়ের আগে সর্বশেষ আলোচিত ফাঁসির আসামি ছিলেন বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। ২০২০ সালে তার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও তা কার্যকর হয়নি।
এ ছাড়া নুসরাত হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত কামরুন্নাহার মণি ও উম্মে সুলতানা পপি, ইডেন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মাহফুজা চৌধুরী হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত রীতা আক্তার, রুমা ওরফে রেশমা, এবং বাবা–মা হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ঐশী রহমানসহ আরও অনেকে এখনো বিভিন্ন কারাগারে রয়েছেন। তাদের ফাঁসি কার্যকর না হওয়ার পেছনে উচ্চ আদালতে মামলার বিচারাধীন থাকা, আপিল, আইনি জটিলতা এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমা আবেদন প্রক্রিয়া উল্লেখযোগ্য কারণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীদের ফাঁসি কার্যকরে আইনি বাধা না থাকলেও সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামো, উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত এবং নীতিগত বিবেচনার কারণে তা বাস্তবে কার্যকর হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আরিফ জামিল মনে করেন, শেখ হাসিনার মামলা স্বভাবগতভাবে অন্য নারীদের মামলার মতো নয়। এটি আন্তর্জাতিক অপরাধের মামলা, এবং আসামি বর্তমানে পলাতক। তিনি দেশে ফিরবেন কি না বা ফিরিয়ে আনা যাবে কি না, তা অনিশ্চিত হওয়ায় রায় কার্যকর হবে কি না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে অপরাধের ধরন ও মামলার প্রেক্ষাপটের কারণে তার বিরুদ্ধে রায় কার্যকর হলে তা প্রথম ঘটনা হলেও অস্বাভাবিক হবে না।





