বগুড়া জেলা প্রতিনিধি : শেষ বুধবার এলেই উৎসবের আমেজে মুখর হয়ে উঠত ইছামতী নদীর তীরবর্তী পোড়াদহ গ্রাম। শুধু একটি গ্রাম নয়, পুরো গাবতলী উপজেলা জুড়েই নেমে আসত আনন্দের ঢল। স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘জামাই মেলা’ নামে—এই পোড়াদহ মেলা উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন লোকজ উৎসব হিসেবে পরিচিত। তবে এবার আর সেই চেনা চিত্র দেখা যাবে না।


আসন্ন ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে চলতি বছর স্থগিত করা হয়েছে ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা। মাঘ মাসের শেষ বুধবার—যেদিন সাধারণত মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়—সেই দিনটি এবার পড়েছে নির্বাচনের আগের দিন (১১ ফেব্রুয়ারি)। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক বিধিনিষেধ এবং আদালতের পুরনো রায়ের কারণে বিকল্প তারিখেও মেলা আয়োজনের সুযোগ থাকছে না।





পোড়াদহ মেলার অন্যতম আয়োজক ও মহিষাবান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ মণ্ডল জানান, ১৯৫৯ সালে মেলার আয়োজকদের সঙ্গে তৎকালীন সরকারের একটি মামলা হয়। সেই মামলার রায়ে আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন—মাঘের শেষ বুধবার অথবা ফাল্গুনের প্রথম বুধবারের মধ্যেই পোড়াদহ মেলা আয়োজন করতে হবে। এর বাইরে কোনো সময় মেলা হলে সরকারের খাজনা গ্রহণের মাধ্যমে মেলাটি সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।


তিনি আরও জানান, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী যদি মাঘ মাসের শেষ বুধবার ২৫ তারিখে পড়ে, তবে মেলা হয় ফাল্গুনের প্রথম বুধবার। আর ২৬ তারিখ বা তার পরে পড়লে মাঘের শেষ বুধবারেই মেলা আয়োজন করতে হয়। এবছর মাঘের শেষ বুধবার পড়েছে ২৮ তারিখে। সে অনুযায়ী ওই দিনই মেলার নির্ধারিত সময় ছিল। কিন্তু নির্বাচন উপলক্ষে ওই দিন এবং পরদিন সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মেলা আয়োজন সম্ভব হয়নি।


উল্লেখ্য, পোড়াদহ মেলার পরদিন অনুষ্ঠিত হয় নারীদের জন্য বিশেষ আয়োজন ‘বউ মেলা’। নির্বাচন ঘিরে দুই দিন যানবাহন চলাচল ও জনসমাগম নিষিদ্ধ থাকায় এই আয়োজনও স্থগিত করা হয়েছে।



ইতিহাস বলছে, প্রায় চার শতাব্দী আগে পোড়াদহ গ্রামে এক সন্ন্যাসীর আগমনকে কেন্দ্র করে একটি বটগাছের নিচে গড়ে ওঠে আশ্রম। সেই আশ্রমে পূজা আয়োজন থেকেই ধীরে ধীরে পোড়াদহ মেলার সূচনা। ধারণা করা হয়, আড়াই শতাধিক বছর ধরে নিয়মিতভাবে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।


এই মেলাকে ঘিরে শ্বশুরবাড়িতে জামাইদের আগমন, বাড়ি বাড়ি আপ্যায়ন, কেনাকাটা আর ইছামতীর তীরে মানুষের মিলনমেলা ছিল গ্রামীণ জীবনের এক অনন্য অনুষঙ্গ। তবে এবার আদালতের একটি পুরনো রায় আর নির্বাচনী বাস্তবতায় থেমে গেল সেই ঐতিহ্যের স্রোত।


উত্তরবঙ্গের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠা বগুড়ার পোড়াদহ মেলা এবার কেবল স্মৃতিতেই রয়ে গেল।