বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এক সময় পরিণত হয়েছিল একটি প্রজন্মের আত্মপরিচয়ের সংগ্রামে। সেই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন কিছু সাহসী শিক্ষক, যাদের কণ্ঠে ভরসা পেয়েছিল দ্বিধাগ্রস্ত জনমত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক গোলাম রব্বানী ও বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শামীমা সুলতানা ছিলেন তেমনই দুই প্রতীকী নাম।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষ নিয়ে দেওয়া অধ্যাপক গোলাম রব্বানীর বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। সেই প্রতিবাদের ভাষা এবং চোখের জল তখন নাড়া দিয়েছিল অসংখ্য মানুষকে। এক বছর পর, সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে স্মৃতিচারণ করলেন তিনি।
অধ্যাপক রব্বানী বলেন, “আমার একটা বোধের জায়গা ছিল—এই হত্যাকাণ্ড ও নৃশংসতা বন্ধ করতে হলে জনসাধারণকে রাস্তায় নামতে হবে। আমি ঘৃণা প্রকাশ করেছিলাম কবি নবারুণ ভট্টাচার্যের ভাষায়, তাদের প্রতি যারা নিরব থেকেছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা এক দানবীয় শক্তিকে উৎখাত করতে পেরেছি। তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে গুণগত পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা এখনও অর্জিত হয়নি।”
আন্দোলনের সময় শিক্ষকদের সাহসিকতার আরেক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শামীমা সুলতানা। ছাত্রজনতার রক্তাক্ত রাজপথের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি তার কার্যালয় থেকে সরিয়ে ফেলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি। পরবর্তীতে এ ঘটনায় তিনি পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের তীব্র প্রতিক্রিয়ায়।
তিনি বলেন, “অনেকে আমার কাছে এসে বলেছেন, একজন শিক্ষক যদি এটি করতে পারেন, তবে আমরা কেন মাঠে নামবো না? তবে তখনই আমার বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট মিটিং ডাকা হয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।”
অধ্যাপক শামীমা বলেন, “গত ১৬ বছরে পেশাজীবীদের মাঝে যে ভয়, তার শৃঙ্খল ভাঙা সহজ ছিল না। তবে সংখ্যায় অল্প হলেও আমরা কিছু শিক্ষক সেই ঝুঁকি নিয়েছি।”
৫ আগস্টের পর নারী নির্যাতন ও শিক্ষকদের ওপর দমন-পীড়নের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই নৃশংসতা আমাদের বিবেককে তাড়িয়ে বেড়ায়।”
এই দুই শিক্ষকের মতে, শিক্ষকতার দায়িত্ব কেবল ক্লাসরুমের পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং সময়মতো রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি দায়বোধ থেকেও মুখ খুলতে হয়। তাঁদের বিশ্বাস, সেই প্রতিবাদই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গঠনের পাথেয় হতে পারে।





