মানুষের জীবনে বিপদ, অপবাদ, একাকিত্ব আর দীর্ঘ অপেক্ষা আসে পরীক্ষা হয়ে। কিন্তু যে ধৈর্য ধরে, সততায় অটল থাকে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে, তার জন্য অন্ধকার সময়ও একদিন সম্মানের আলো হয়ে ওঠে। এই সত্যের উজ্জ্বল উদাহরণ হজরত ইউসুফ (আ.)।


\r\n

কুরআনে তাঁর জীবনকাহিনি এত সুন্দর ও শিক্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে আল্লাহ তাআলা নিজেই বলেছেন—

\r\n

نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ الْقَصَصِ
\r\n“আমি তোমার কাছে সর্বোত্তম কাহিনি বর্ণনা করছি।”
\r\n(সুরা ইউসুফ: ৩)

\r\n

শৈশবের স্বপ্ন, ঈর্ষার শুরু

\r\n

শৈশবে ইউসুফ (আ.) এক আশ্চর্য স্বপ্ন দেখেন—

\r\n

إِذْ قَالَ يُوسُفُ لِأَبِيهِ يَا أَبَتِ إِنِّي رَأَيْتُ أَحَدَ عَشَرَ كَوْكَبًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ رَأَيْتُهُمْ لِي سَاجِدِينَ
\r\n“হে আমার পিতা, আমি দেখেছি এগারোটি নক্ষত্র, সূর্য ও চাঁদ—তারা আমাকে সিজদা করছে।”
\r\n(সুরা ইউসুফ: ৪)

\r\n

এই স্বপ্ন ভবিষ্যতের উচ্চ মর্যাদার ইঙ্গিত বহন করছিল। কিন্তু ভাইদের ঈর্ষা তাকে কূপে নিক্ষেপের মাধ্যমে কঠিন পরীক্ষায় ফেলে। পরে কাফেলার মাধ্যমে তিনি মিসরে দাস হিসেবে বিক্রি হন।

\r\n

দাসত্ব থেকে কারাগার

\r\n

মিসরে আজিজের ঘরে তিনি সততা ও চরিত্রের দৃঢ়তায় সবার আস্থা অর্জন করেন। কিন্তু অন্যায়ের শিকার হয়ে কারাগারে বন্দি হন। সে সময়ও তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং দোয়া করেন—

\r\n

رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ
\r\n“হে আমার রব, তারা আমাকে যে কাজে আহ্বান করছে তার চেয়ে কারাগারই আমার কাছে প্রিয়।”
\r\n(সুরা ইউসুফ: ৩৩)

\r\n

এখানে তাঁর তাকওয়া ও আত্মসম্মানের শক্ত অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

\r\n

কারাগারে দাওয়াত

\r\n

কারাগারেও তিনি দ্বীনের দাওয়াত বন্ধ করেননি। স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়ার আগে তাওহিদের আহ্বান জানান—

\r\n

يَا صَاحِبَيِ السِّجْنِ أَأَرْبَابٌ مُّتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ
\r\n“হে কারাগারের দুই সাথী, বহু উপাস্য কি উত্তম, না একক পরাক্রমশালী আল্লাহ?”
\r\n(সুরা ইউসুফ: ৩৯)

\r\n

তার ব্যাখ্যা সত্য প্রমাণিত হয় এবং সেখান থেকেই মুক্তির পথ তৈরি হয়।

\r\n

রাজদরবারে সম্মান

\r\n

মিসরের বাদশাহের স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি দুর্ভিক্ষ মোকাবিলার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তাঁর প্রজ্ঞা ও সততায় মুগ্ধ হয়ে বাদশাহ বলেন—

\r\n

إِنَّكَ الْيَوْمَ لَدَيْنَا مَكِينٌ أَمِينٌ
\r\n“আজ থেকে তুমি আমাদের কাছে ক্ষমতাবান ও বিশ্বস্ত।”
\r\n(সুরা ইউসুফ: ৫৪)

\r\n

পরে তিনি দেশের ভাণ্ডারের দায়িত্ব চান—

\r\n

اجْعَلْنِي عَلَى خَزَائِنِ الْأَرْضِ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ
\r\n“আমাকে দেশের ভাণ্ডারের দায়িত্ব দিন; নিশ্চয়ই আমি সংরক্ষণকারী ও জ্ঞানী।”
\r\n(সুরা ইউসুফ: ৫৫)

\r\n

একজন কূপে নিক্ষিপ্ত কিশোর, দাস ও বন্দি—আল্লাহর পরিকল্পনায় তিনিই হয়ে উঠলেন অর্থব্যবস্থার প্রধান।

\r\n

শিক্ষা

\r\n

কুরআনের ঘোষণা—

\r\n

إِنَّهُ مَن يَتَّقِ وَيَصْبِرْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ
\r\n“যে তাকওয়া অবলম্বন করে এবং ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না।”
\r\n(সুরা ইউসুফ: ৯০)

\r\n

ইউসুফ (আ.)-এর জীবন আমাদের মনে গেঁথে দেয় কয়েকটি স্থায়ী সত্য—

\r\n
    \r\n
  • \r\n

    ঈর্ষা ও ষড়যন্ত্র ক্ষণস্থায়ী

    \r\n
  • \r\n
  • \r\n

    ধৈর্য দীর্ঘস্থায়ী

    \r\n
  • \r\n
  • \r\n

    চরিত্রের পবিত্রতা শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়

    \r\n
  • \r\n
  • \r\n

    আল্লাহর পরিকল্পনাই চূড়ান্ত

    \r\n
  • \r\n
\r\n

কূপের অন্ধকার থেকে রাজদরবারের সম্মান—এই পথচলা কেবল ইতিহাস নয়, প্রতিটি মুমিনের জন্য অনুপ্রেরণা।

\r\n

আল্লাহ আমাদের ধৈর্য, সততা ও আমানতদারিতায় দৃঢ় থাকার তাওফিক দিন। আমিন।