কৃষ্ণসাগরে ইউক্রেনের নৌবাহিনীর ড্রোন হামলার মুখে পড়ে মৃত্যু ভেবে নিয়েছিলেন এমটি কায়রোস তেলবাহী জাহাজে থাকা বাংলাদেশি নাবিকরা। কয়েক মুহূর্তে আগুনে গ্রাস হওয়া জাহাজ, বিস্ফোরণ আর ছড়িয়ে পড়া জ্বালানির মধ্যে দাঁড়িয়ে তাদের মনে হয়েছিল, আর ফেরা হবে না। সেখান থেকে অলৌকিকভাবে তাদের উদ্ধার করেন তুরস্কের কোস্টগার্ড সদস্যরা।


নরসিংদীর মাহফুজুল ইসলাম, কুষ্টিয়ার আল আমিন, ঢাকার ধামরাইয়ের হাবিবুর রহমান এবং চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের আজগর হোসাইনসহ মোট চারজন বাংলাদেশি ছিলেন এই জাহাজে। হামলার পর প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে তারা এখন তুরস্কের একটি হোটেলে নিরাপদে আছেন।



চতুর্থ প্রকৌশলী মাহফুজুল ইসলাম তুরস্ক থেকে হামলার মুহূর্তের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, শুক্রবার বিকেল ৪টা ৪৬ মিনিটে প্রথম ড্রোন প্রপেলারে আঘাত করে। জাহাজে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি লাগে, ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দ্বিতীয় ড্রোন আঘাত হানে জ্বালানি ট্যাংকে। বিস্ফোরণে চারদিকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।


তিনি বলেন, “লাইফবোট পুড়ে গেছে। তেল আর আগুনের কারণে সাগরে ঝাঁপ দেওয়াও সম্ভব ছিল না। প্রচণ্ড ঠান্ডায় পানিতে নামলে জমে মরতাম। তখন আমরা মনে করেছিলাম, বাঁচার আর কোনো পথ নেই। একজন আরেকজনের কাছ থেকে শেষ বিদায় নিচ্ছিলাম।”



জাহাজের ক্যাডেট আল আমিন বলেন, বিস্ফোরণের পর তারা লাইফবোট নামানোর চেষ্টা করলেও তীব্র বাতাস ও আগুনে লাইফবোট নিজেই পুড়ে বিস্ফোরিত হয়। তিনি বলেন, “চারদিকে আগুন আর দাহ্য পদার্থ উড়ছিল। কোনো উপায় দেখছিলাম না।”


ধামরাইয়ের নাবিক হাবিবুর রহমান বলেন, “আমরা তো ভাবছিলাম সব শেষ। মাফ চেয়ে নিচ্ছিলাম একে অন্যের কাছে। মনে হচ্ছিল জীবন এখানে শেষ হয়ে যাবে।”


ডেকে থাকা আজগর হোসাইন জানান, হামলার আগে তিনটি দ্রুতগতির নৌযান তাদের পিছু নেওয়ার মতো মনে হয়েছিল। পরে বুঝতে পারেন সেগুলোই ছিল ড্রোন। “লাইফ জ্যাকেট পরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, কিন্তু ঠান্ডার জন্য পানিতে নামা সম্ভব ছিল না। আর পানিতেও আগুন। ভাবতেই এখনো শিউরে উঠি,” বলেন তিনি।



হামলার পর জাহাজ থেকে তুরস্কের কোস্টগার্ডকে খবর দেওয়া হয়। তাদের পৌঁছাতে এক ঘণ্টা সময় লাগত। এর মধ্যে পাশের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ লাইফবোট পাঠালেও আগুনের কারণে কাছে আসতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তুরস্কের কোস্টগার্ড এসে ২৫ নাবিককে উদ্ধার করে।



বাংলাদেশি নাবিকদের নিরাপত্তায় শুরু থেকেই যোগাযোগ রাখছিল Bangladesh Merchant Marine Officers’ Association। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “আমরা আইটিএফকে জানিয়েছি জরুরি সহায়তার জন্য। তবে জাহাজ মালিক ও তুরস্ক কর্তৃপক্ষ সব ধরনের সহায়তা দিচ্ছে। নাবিকরা নিরাপদ আছে—এটাই স্বস্তির খবর।”



রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এ নিয়ে দ্বিতীয়বার প্রাণঘাতী হামলার মুখে পড়লেন বাংলাদেশি নাবিকরা। ২০২২ সালের ২ মার্চ ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে রাশিয়ার মিসাইল হামলায় ‘বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজে নিহত হন প্রকৌশলী হাদিসুর রহমান। তখন আটকে পড়া ২৮ বাংলাদেশিকে পরে জীবিত উদ্ধার করা হয়।


কৃষ্ণসাগরে এমটি কায়রোসে হামলার ঘটনাও সেই দুঃসহ স্মৃতিকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। তবে অলৌকিকভাবে চার বাংলাদেশিসহ পুরো ক্রু এবার জীবিত ফিরে এসেছেন।