দীর্ঘ ১৫ বছর হতে চললেও যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেই কোনো কমিটি। ফলে এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা-ক্ষোভ ও বিভাজন তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কয়েকজন নেতা কালবেলাকে জানান, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে হামলা-মামলা ও নির্যাতনের শিকার হলেও আজ তাদের কোনো দলীয় পরিচয় নেই।
কমিটিবিহীন চলছে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির রাজনীতি। পদ-পদবি না পেয়েও অনেক নেতাকর্মী ক্ষুব্ধ এবং কমিটি না থাকায় অনেকেই পৃথকভাবে কর্মসূচি পালন করছেন। অথচ বছরখানেক আগেও শেখ হাসিনার পতনের দাবিতে সক্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলো। এমন অবস্থায় গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে হেনস্তার ঘটনায় বিএনপির সাংগঠনিক সক্ষমতায় নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এজন্য বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকনকে দায়ী করছেন অনেকেই।
তারা বলছেন—বিএনপির মহাসচিবকে স্বাগত জানানোর জন্য নিজেই দায়িত্ব নেন খোকন। তিনি কোনো ধরনের সমন্বয় করতে পারেননি এবং নিজেও মির্জা ফখরুলকে রিসিভ করেননি। তা ছাড়া দলে আরও অভিজ্ঞ এবং সিনিয়র নেতা থাকতে শুধু খোকনকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় রাষ্ট্রের কমিটি গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে তাদের। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি নেতাকর্মীরা অবিলম্বে দেড় দশকের ত্যাগ ও পরিশ্রমের মূল্যায়নের জন্য দ্রুত কমিটির দাবি জানান।
এদিকে আট মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির ব্যানারে কোনো কর্মসূচি পালন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে বিএনপি। কেউ যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির ব্যানারে কর্মসূচি পালন করলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। গত ১৭ জানুয়ারি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়, যা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপিতে তোলপাড় চলছে। যদিও নেতাকর্মীদের দাবি, এই নিষেধাজ্ঞা কাদের বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছে। এখানে দলীয় শৃঙ্খলা কিংবা কোনো ধরনের নিয়ম ভঙ্গের মতো কিছু ঘটেনি। নেতাকর্মীরা শুধু চলমান কর্মসূচি দলীয় ব্যানারে পালন করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিগত দিনে বিশ্বের অন্য দেশে সংগঠনের কমিটি দিয়ে দলকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয় বিএনপি। দলটির গঠনতন্ত্রের ১৬নং ধারায় বলা আছে—‘প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশিগণের মধ্যে যারা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নীতি, আদর্শ, উদ্দেশ্য ও কর্মসূচিতে বিশ্বাস করেন তারা যেসব দেশে স্থায়ী কিংবা অস্থায়ীভাবে বসবাস করেন, সেসব দেশের প্রচলতি আইনে সংগঠন প্রতিষ্ঠা/পরিচালনা করতে পারবেন’। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রবাসী নেতাকর্মীদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপির কমিটি নেই গত প্রায় ১৫ বছর ধরে। আর বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেট ও মহানগরের কমিটি গঠনের দায়িত্ব পেয়ে চরম স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিজ বলয়ের লোকদের নিয়ে কমিটি দিয়েছেন। কিন্তু সেসব নেতাকর্মীরা কোনো কর্মসূচিও পালন করতে পারেনি। এ বিষয়ে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফলাওভাবে সমালোচনা করতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে নিউইয়র্ক স্টেট বিএনপির কমিটি গঠনের বিষয়ে খোকনের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে আনোয়ার হোসেন খোকন বলেন, ‘আমার নিজস্ব কোনো বলয় নেই, সবাই বিএনপির লোক। যুক্তরাষ্ট্র অনেক বড় দেশ। এখানে এক স্টেট থেকে অন্য স্টেটে যেতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। আগে নিউইর্য়কভিত্তিক রাজনীতি হতো। এখন পর্যন্ত ১৮ স্টেট কমিটি দিয়েছি। কোথাও অনৈতিক কিছু কেউ দেখাতে পারবে না’।
যুক্তরাষ্ট্র শাখা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ডা. মজিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ যখন কেউ কথা বলতে পারেনি তখন আমরা কথা বলেছি। কিন্তু স্টেট ও মহানগর কমিটি দেখে নেতাকর্মীরা হতাশ। বিগত সময়ের ত্যাগী ও নির্যাতিতদের মূল্যায়ন করা হয়নি। গ্রুপিং-কোন্দলের কারণে কয়েকবার কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বিএনপির নেতাকর্মীরা কয়েকটা ব্যানারে বিভক্ত হয়ে কর্মসূচি পালন করছেন। সাবেক সভাপতি সম্রাট, সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান, শরাফত হোসেন বাবু—তিনটি ব্যানারে কার্যক্রম পালন করে আসছিলেন। কিন্তু ২০১৯ সালের পর বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকনকে সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়ার পর জুমের মাধ্যমে তিন স্টেট ও মহানগরের নামে আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়। তার পরও যুক্তরাষ্ট্র শাখা বিএনপির বিভিন্ন গ্রুপ বিচ্ছিন্নভাবে কর্মসূচি পালন করছে।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অনেক বড় দেশ। তাই সেখানে বিভিন্ন স্টেট কমিটির মাধ্যমে বিএনপি চলছে। তারা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। বিগত দিনে গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে জোরালো ভূমিকা পালন করেছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে সেন্ট্রাল কোনো কমিটি থাকবে না। একজন আন্তর্জাতিক সম্পাদককে কেনো যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার কমিটি গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে? এমন প্রশ্নে উত্তরে আমীর খসরু বলেন, দল যাকে যেখানে দায়িত্ব দেওয়া দরকার সেখানেই কাজে লাগাচ্ছে।
দলের চেয়ারপারসনস ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজারি কমিটির বিশেষ সহকারী বদরুল আলম চৌধুরী শিপলু কালবেলাকে বলেন, দলের কোন নেতা কোথায় কী করেন তার সব খবর তারেক রহমানের কাছে আছে। কখন কোথায় কী সিদ্ধান্ত নিতে হবে তা তিনি ভালো করে জানেন। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিশ্বের প্রায় সব দেশে বিএনপির অনেক কমিটি করা হয়েছে, এটা তো সহজ কাজ নয়। কোনো কাজের ভালোমন্দ উভয় দিকই থাকে। দিনশেষে ঐক্যবদ্ধ থাকাটা আমাদের মূল কথা।





