আলোচিত কিশোরী ফেলানী হত্যার ১৫ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১১ সালের এই দিনে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সদস্যের গুলিতে নিহত হয় ফেলানী খাতুন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা কাঁটাতারের সঙ্গে ঝুলে ছিল তার মরদেহ। দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও আজও কাঙ্ক্ষিত বিচার পায়নি তার পরিবার।
২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি বাবা নূরুল ইসলামের সঙ্গে ৯৪৭ নম্বর আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলারের পাশ দিয়ে মই বেয়ে কাঁটাতার পার হয়ে দেশে ফিরছিল ফেলানী। এ সময় ভারতের চৌধুরীহাট ক্যাম্পের টহলরত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ তাকে গুলি করে হত্যা করেন। ঘটনার পর থেকে ন্যায়বিচারের আশায় বিভিন্ন মহলে আবেদন করলেও কোনো সুরাহা মেলেনি বলে অভিযোগ পরিবারের।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের দক্ষিণ রামখানা কলোনিটারী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ‘ফেলানী দিবস’ উপলক্ষে কবরস্থান ও আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করছেন স্বজনরা। সেখানেই কথা হয় ফেলানীর বাবা-মায়ের সঙ্গে।
ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম ও মা জাহানারা জানান, সেই ভয়াবহ স্মৃতি আজও তাদের তাড়া করে ফেরে। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায় মেয়ের আর্তচিৎকারের কল্পনায়। ১৫ বছর ধরে শোক আর অপেক্ষার মধ্যেই দিন কাটছে তাদের। মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেও ন্যায়বিচার মেলেনি বলে জানান তারা।
জুলাই বিপ্লবের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও প্রতিবেশী দেশের সরকারের মধ্যে সীমান্ত হত্যা ইস্যুতে আলোচনার প্রেক্ষাপটে গত ৯ ডিসেম্বর গুলশান-২ থেকে প্রগতি স্মরণী পর্যন্ত সড়কটির নাম ‘ফেলানী সড়ক’ নামকরণ করা হয়। এর আগে ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর পিপলস অ্যাকটিভিস্ট কোয়ালিশন (প্যাক) সীমান্ত হত্যার প্রতিবাদে ভারতীয় দূতাবাসসংলগ্ন একটি সড়কের নাম ‘শহীদ ফেলানী সড়ক’ ঘোষণা করে নামফলক স্থাপন করে।
গত কয়েক বছর ধরে ৭ জানুয়ারিকে ‘ফেলানী দিবস’ ঘোষণা, হত্যার বিচার, ফেলানীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং বারিধারা পার্ক রোডের নাম ‘ফেলানী স্মরণী’ করার দাবিতে কর্মসূচি পালন করে আসছে নাগরিক পরিষদ।
সংগঠনটির আহ্বায়ক মোহাম্মদ শামসুদ্দীন বলেন, দাবি অনুযায়ী সড়কের নামকরণ না হলেও গুলশান-২ থেকে প্রগতি স্মরণী পর্যন্ত সড়কের নাম ‘ফেলানী সড়ক’ করায় তারা সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি জানান, ২০১৫ সালে জাতিসংঘ মহাসচিব বরাবর বিশ্বব্যাপী সীমান্ত হত্যা বন্ধ ও ৭ জানুয়ারিকে ফেলানী দিবস ঘোষণার দাবিতে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে কোনো রাষ্ট্রীয় প্রস্তাব না আসায় উদ্যোগটি বাস্তবায়ন হয়নি।
ফেলানী হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহার জেলার বিএসএফের ১৮১ সদর দপ্তরে গঠিত জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে। একই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত অমিয় ঘোষকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়। এ রায় প্রত্যাখ্যান করে ফেলানীর বাবা ১১ সেপ্টেম্বর ভারত সরকার বরাবর চিঠি দেন। ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনর্বিচার শুরু হলেও তা বারবার স্থগিত হয়।
২০১৫ সালে আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ ক্ষতিপূরণের দাবিতে আরেকটি মামলা করে। ওই বছরের ৩১ আগস্ট ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ফেলানীর পরিবারকে ৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করলেও ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এতে ভিন্নমত পোষণ করে। পরবর্তীতে ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে একাধিকবার শুনানি পেছানো হয়। সর্বশেষ ২০২০ সালের ১৮ মার্চ শুনানির দিন ধার্য হলেও তা আজও অনুষ্ঠিত হয়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, ফেলানী হত্যা মামলাটি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে এবং এখনো কোনো অগ্রগতি নেই।





