প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, সরকার টাকা বা জমি দিতে শুরু করলে ভুল লোকগুলোই আগে সামনে আসে, আর প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হয়। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি সরকারের কাছ থেকে কিছু চাইতে আসে, তাকে সন্দেহের চোখে দেখলেই প্রকৃত চিত্রটি বোঝা যায়।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) দুপুরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।
ড. ইউনূস বলেন, আমরা প্রায়ই সরকারের কাছে টাকা বা জমির দাবি করি। এগুলো প্রয়োজনীয় হলেও সরকার যখন তা দেওয়া শুরু করে, তখন সুযোগসন্ধানীরা তা হাতিয়ে নেয়। ফলে প্রকৃত মানুষ আর সুযোগ পায় না। তাঁর মতে, সরকারের কাছে কিছু চাওয়ার বদলে নীতি ঠিক করে দেওয়ার দাবি জানানো উচিত। সঠিক নীতি থাকলে মানুষ নিজেরাই বাকিটা সামাল দিতে পারে।
তিনি বলেন, সরকার শুধু একটি মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি বড় কাঠামো। কিন্তু প্রযুক্তির গতি এত দ্রুত যে প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকেরা দ্রুত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছেন। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় যেভাবে পরিস্থিতি থাকে, খুব অল্প সময়েই তা বদলে যায়। অথচ সিদ্ধান্তদাতারা নিজেরা বদলান না। ফলে পরিবর্তন যারা নিজের চোখে দেখছেন, তাদের দিয়েই নতুন পথে এগোতে হবে।
সরকারি কর্মচারীদের বিষয়ে তিনি বলেন, পাঁচ বছরের বেশি একই জায়গায় থাকলে মানসিকতা একরকম হয়ে যায় এবং সৃজনশীলতা নষ্ট হয়। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে পুরোনো জ্ঞান নিয়ে কাজ করলে চলবে না। প্রযুক্তি খাতে এমন লোক দরকার, যারা পরিবর্তন অনুভব করছেন এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারেন।
ড. ইউনূস আরও বলেন, প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের সঙ্গে নীতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। পুরোনো নথি ঘেঁটে নিয়ম সংশোধনের প্রবণতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ব্রিটিশ আমলের কাঠামোর ওপর সামান্য সংশোধন করে চললে হবে না। গোড়া থেকেই নতুন করে ভাবতে হবে। প্রযুক্তি যেখানে পুরোনোকে ফেলে সামনে এগোয়, সেখানে সরকার পুরোনো আঁকড়ে ধরে রাখে। এই দ্বন্দ্বে প্রযুক্তিকেই জিততে দিতে হবে, নইলে দেশ পিছিয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন একটি বিষয়ে বিশ্বে পরিচিত হয়ে উঠেছে, তা হলো জালিয়াতি। ভুয়া ভিসা, ভুয়া পাসপোর্ট ও জাল সনদের কারণে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি কিছু দেশ বাংলাদেশি পাসপোর্ট গ্রহণ করতেও অনীহা দেখাচ্ছে।
একটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশের মন্ত্রীর সঙ্গে আলাপের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, জাল সনদের কারণে সে দেশ বাংলাদেশিদের প্রবেশাধিকার সীমিত করেছে। এমনকি বাংলাদেশি নাবিকদের ক্ষেত্রেও কঠোরতা দেখানো হচ্ছে। ওই মন্ত্রী ফাইল খুলে দেখান, কীভাবে ভুয়া সার্টিফিকেট ও কাগজপত্রের কারণে আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা যদি এখনই নিজেদের সংশোধন না করি, তাহলে আধুনিক প্রযুক্তিও জালিয়াতির হাতিয়ার হয়ে উঠবে। হাজারে হাজারে মানুষ ভুয়া সার্টিফিকেট ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট নিয়ে বিদেশে যাচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে অফিসিয়াল জায়গা থেকেই ইস্যু হচ্ছে। প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ কোনোভাবেই জালিয়াতির কারখানা হতে পারে না এবং হতে দেওয়া হবে না।





