বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে প্রথমে বিজয়ী পক্ষকে অভিনন্দন জানানোর রেওয়াজ সব সময়ই ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়েই চলে এসেছে। মনমোহন সিং হোক বা নরেন্দ্র মোদি—চারটি নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় এ নিয়ম অটুট ছিল।
এবারও ১৩ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার সকালেই সেই রেওয়াজ পূর্ণ হলো। তবে প্রেক্ষাপট ভিন্ন—আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি, আর প্রধানমন্ত্রীর পদে নতুন নেতৃত্ব এসেছে।
মোদি শুক্রবার সকালে এক্স-এ হ্যান্ডলে পোস্টে বলেন, সংসদীয় নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণ তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রদর্শন করেছে। পরবর্তীতে তিনি একই বার্তা বাংলায়ও শেয়ার করেন এবং সরাসরি তারেক রহমানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।
দিল্লির কূটনৈতিক মহলে এটি সাধারণ সৌজন্য হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ‘টোন সেটিং’ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। যে তারেক রহমানের প্রতি এক সময় ভারতের পক্ষ থেকে প্রকাশ্য দূরত্ব ছিল, এবার তার প্রতি এত দ্রুত ও প্রকাশ্য উষ্ণতা নজিরবিহীন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে, টানা চার মেয়াদ ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের পতনের পর ভারতের অবস্থান পরিবর্তন তাৎপর্যপূর্ণ।
২০১৪ সালে বিজেপি প্রথমবার ক্ষমতায় আসার সময় তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসিত ছিলেন। সে সময়ে বিএনপি-ভারত সম্পর্ক গড়ে ওঠার প্রত্যাশা থাকলেও, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ও শেখ হাসিনার স্পর্শকাতর অবস্থানের কারণে কোনো বাস্তব সাড়া হয়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গিতেও বড় পরিবর্তন আসে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি ভারতের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাবেক কূটনীতিকরা মনে করেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তার কারণে নির্বাচিত বিএনপি সরকার ‘অটোমেটিক চয়েস’ হয়ে উঠেছে।
তবে ভারতের এই আগ্রহ নিঃশর্ত নয়। দিল্লি স্পষ্ট করেছে, নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক হবে ইস্যুভিত্তিক। বিশেষত, হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ভারতীয় নীতি প্রাধান্য পাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি তাদের অতীতের কঠোর ভারত-বিরোধী অবস্থান থেকে সরে এসে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অনুসারে সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী। সাম্প্রতিক বক্তব্যে ভারতের প্রতি সরাসরি আক্রমণ না করাও ইতিবাচক বার্তা হিসেবে ধরা হচ্ছে।
একই সঙ্গে মনে করা হচ্ছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু বা অতীত বিতর্কিত বিষয় নিয়ে নতুন সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল করতে চাইবে না। মনোহর পারিক্কর আইডিএসএ-র সিনিয়র ফেলো স্ম্রুতি পট্টনায়ক বলেন, পুরনো ইস্যুগুলো হয়তো মুখে উল্লেখ করা হবে, তবে তা দিল্লির সঙ্গে আলোচনা থামাবে না।
পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার মনে করেন, বাংলাদেশে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার আশা কম।
সবমিলিয়ে, শেখ হাসিনার পতনের পর ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন পর্বে প্রবেশ করেছে। মোদির দ্রুত অভিনন্দন বার্তা এ পরিবর্তনের প্রথম প্রকাশ্য ইঙ্গিত। এখন দেখার বিষয়—এই কূটনৈতিক উষ্ণতা কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে এবং বাস্তব নীতিতে কতটা প্রতিফলিত হবে।





