র‍্যাব ও সিটিটিসির শীর্ষ কর্মকর্তারা গুমের ঘটনাগুলো সম্পর্কে অবগত ছিলেন—এমন তথ্য উঠে এসেছে জোরপূর্বক গুম সম্পর্কিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে। হুম্মাম কাদের চৌধুরী ও মীর আহমদ বিন কাসেম (ব্যারিস্টার আরমান)সহ একাধিক ব্যক্তির গুমের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের জ্ঞান ও সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ৪ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, হুম্মাম কাদের চৌধুরীর গুমের বিষয়টি তৎকালীন ডিজিএফআই মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ আকবর হোসেন সরাসরি তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানিয়েছিলেন। কমিশনের সামনে হাজির হয়ে তিনি জানান, শেখ হাসিনা তাকে হুম্মামকে মুক্তি দেওয়ার কথা বলেন এবং বিষয়টি মেজর জেনারেল তারিক সিদ্দিককে জানানো হয়েছে কি না, সে প্রশ্নও করেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মীর আহমদ বিন কাসেমের গুমের ঘটনাও সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের জানা ছিল। র‍্যাবের সাবেক মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে বলেন, ব্যারিস্টার আরমান যে র‍্যাবের হেফাজতে ছিলেন, তা সংস্থার জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব ভালোভাবেই জানতেন।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে ব্রিগেডিয়ার আজমির গুম নিয়ে সেনাবাহিনীর কোর্ট অব ইনকোয়ারির প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে কমিশন জানায়, তার প্রাথমিক অপহরণ ও আটকের অনুমোদন দিয়েছিলেন তৎকালীন ডিজিএফআই প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আকবর। পরবর্তী সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিজিএফআই মহাপরিচালকরাও ক্ষমতার অপব্যবহার করে তার অননুমোদিত আটক অব্যাহত রাখেন।

সিটিআইবির সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল কবির আহমেদ কমিশনকে জানান, জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) ব্রিগেডিয়ার আজমির আটক থাকার বিষয়টি তিনি তার অধীন দুই ডিরেক্টর জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। একইভাবে ডিজিএফআই কর্মকর্তা মেজর জেনারেল এ কে এম আমিনুল হক বলেন, ব্রিগেডিয়ার আজমিকে তুলে আনার আদেশ তিনি সরাসরি লেফটেন্যান্ট জেনারেল আকবরের কাছ থেকেই পেয়েছিলেন।

নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সাক্ষ্যেও উঠে এসেছে, সিটিআইবি, সিটিটিসি ও ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে আটক কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করতেন। একাধিক সৈনিক ও কর্মকর্তা জানান, এসব পরিদর্শনের আগে সংশ্লিষ্ট ইউনিটকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হতো। এমনকি ঈদের দিনেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের উদাহরণ পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বগুড়া, কক্সবাজার, দিনাজপুর ও বাগেরহাটসহ বিভিন্ন পুলিশ লাইনসে আটক কক্ষগুলো এমন স্থানে ছিল, যা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চোখ এড়িয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। র‍্যাবের বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন ও ডিটেনশন সেন্টারের সেলগুলোও কমান্ডিং অফিসারদের কার্যালয়ের কাছাকাছি এবং সিসিটিভি নজরদারির আওতায় ছিল।

সব তথ্য ও সাক্ষ্য একত্রে বিশ্লেষণ করে তদন্ত কমিশনের অভিমত, দীর্ঘ সময় ধরে চলা এসব গুম ও অবৈধ আটক সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানতেন না—এমন দাবি বিশ্বাসযোগ্য নয়।