বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির ফলে চলতি অর্থবছরেই আমদানি শুল্ক থেকে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব হারাতে পারে বলে আশঙ্কা জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) রাজধানীতে আয়োজিত ‘২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট সুপারিশ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ তথ্য তুলে ধরে সংস্থাটি। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
সিপিডির হিসাব অনুযায়ী, বাণিজ্য চুক্তির কারণে সরকারের প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়মের কারণে ভবিষ্যতে অন্যান্য সদস্য দেশও একই ধরনের সুবিধা দাবি করতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য নতুন নীতিগত চাপ তৈরি করতে পারে।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাংলাদেশ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ নামে একটি বাণিজ্য চুক্তি করেছে। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার পণ্য শুল্কমুক্তভাবে আমদানির সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে আরও দুই হাজার ২১০ ধরনের পণ্যে শুল্ক ছাড় দিতে হতে পারে। এতে আমদানি শুল্ক থেকে সরকারের আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তার মতে, এ ব্যবস্থার ফলে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে বাজার সুবিধা পেতে পারে, যা ডব্লিউটিওর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদে দেশের বাণিজ্য নীতিতে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য কেনার শর্ত থাকায় সরকারি ব্যয়ও বাড়তে পারে। তাই রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে।
গোলটেবিল বৈঠকে সিপিডির সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাণিজ্য এখন ক্রমেই রাজনৈতিক ও কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির বিষয়বস্তু আরও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নের বড় অংশই বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করবে। তবে উদ্যোক্তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিতে উৎসাহিত করতে হলে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হতে পারে। অন্যথায় অন্য দেশের পরিবর্তে কেন যুক্তরাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে— সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। এ ধরনের শর্ত বাণিজ্যিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বৈঠকে সিপিডি জানায়, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জানুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ। বাকি সময়ে লক্ষ্য পূরণ করতে হলে প্রায় ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ হারে রাজস্ব সংগ্রহ করতে হবে, যা বাস্তব পরিস্থিতিতে অত্যন্ত কঠিন।
বর্তমানে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলেও জানানো হয়। রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিত মাত্রায় না হওয়ায় সরকারকে ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হয়েছে। চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংক থেকে ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংক-বহির্ভূত ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
সিপিডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার ফলে আর্থিক খাতে চাপ তৈরি হচ্ছে এবং এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও কমে যাচ্ছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ পড়তে পারে।
সংস্থাটি আরও জানায়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ২০ দশমিক ৩ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে রপ্তানি আয় কমেছে ৩ দশমিক ২ শতাংশ, আর আমদানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
সিপিডির মতে, আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের সময় অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ না করাই ভালো। পাশাপাশি কর–জিডিপি অনুপাত বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব সংস্কার, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সংস্থাটি মনে করে, বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়ার কারণে কর্মসংস্থানের সুযোগও কমছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক সংকেত।





