দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেলের ১২টি প্যাকেজের মধ্যে দুটি প্যাকেজের নির্মাণকাজের চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) থেকে রবিবার ও সোমবার জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থাকে (জাইকা) পাঠানো দুটি পৃথক চিঠিতে এই প্রস্তাব জানানো হয়। চিঠিতে স্বাক্ষর করেন প্রকল্প পরিচালক মো. আফতাব হোসাইন।
ডিএমটিসিএলের পরিচালনা পর্ষদের ৭১তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাবে (ডিপিপি) নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি দর চাওয়া ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা যেতে পারে। তবে “অত্যধিক ব্যয়” বলতে মূল দরের কত শতাংশ বেশি বোঝানো হয়েছে, তা সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ নেই।
ডিএমটিসিএলের চিঠিতে বলা হয়, বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিযুক্ত ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। জাইকার ঋণ চুক্তি ও নির্দেশিকার আলোকে চুক্তি বাতিলে সম্মতি চাওয়া হয়েছে।
বাতিলের প্রস্তাব দেওয়া দুটি প্যাকেজ হলো—
সিপি-২: ডিপোর অবকাঠামো ও ভবন নির্মাণের কাজ, যার ঠিকাদার চীনের সিনোহাইড্রো।
সিপি-৫: নর্দা থেকে নতুন বাজার পর্যন্ত টানেল ও স্টেশন নির্মাণের কাজ, যার ঠিকাদার জাপানের কাজিমা করপোরেশন।
ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুখ আহামেদ বলেন, “চুক্তি বাতিলের বিষয়টি চূড়ান্ত নয়। এটি আসলে আলোচনার (নেগোশিয়েশন) সুযোগ তৈরি করার অংশ। যদি ব্যয় কমে, তারা কাজ চালাবে; না হলে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হবে।”
তিনি জানান, ২০১৯ সালের মূল দরের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি ব্যয় স্বাভাবিক ধরা যেতে পারে, ৫০ শতাংশের বেশি হলে সেটি অযৌক্তিক বলে গণ্য হবে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, “চুক্তি বাতিলের বিষয়টি স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়া বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কূটনৈতিক সম্পর্কও বিবেচনায় রাখা জরুরি।”
সূত্র জানায়, আগের সরকারের সময়ে করা কিছু চুক্তি নিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সংশয়ে আছে। ফলে বেশ কয়েকটি প্যাকেজের কাজ এখনো শুরু হয়নি। ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার প্রয়োজনে জাইকার ঋণ চুক্তি বাতিলের বিষয়টিও বিবেচনা করছে এবং বিকল্প অর্থায়নের পথ খুঁজছে।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাতাল মেট্রোরেলের অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয়। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ডিপো নির্মাণের মধ্য দিয়ে প্রকল্পের উদ্বোধন হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কাজের অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর।
ডিএমটিসিএলের সর্বশেষ সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে, এমআরটি লাইন-১ ও ৫ (উত্তর)–এর কার্যক্রম সংকুচিত হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। এখন পর্যন্ত কেবল ডিপোর ভূমি উন্নয়নসংক্রান্ত কাজই কিছুটা অগ্রসর হয়েছে।
প্রকল্পের সারসংক্ষেপ:
লাইন: এমআরটি লাইন-১ (কাঞ্চন সেতু থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ৩১.২৪ কিমি)
মাটির নিচে: ১৯.৮৭ কিমি
উড়ালপথে: ১১.৩৭ কিমি
মোট ব্যয়: ৫২,৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা
অর্থায়ন: জাইকা ৩৯,৪৫০ কোটি ৩২ লাখ, সরকার ১৩,১১১ কোটি ১১ লাখ টাকা
২০১৯ সালে প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয়; তখন নকশা, জরিপ ও ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়। রূপগঞ্জে ৯৩ একর জমিতে ডিপো নির্মাণের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়।





