আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে দেশের নিরাপত্তা জোরদার করতে সব সীমান্তের ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। নির্বাচনের সময় ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি যেন দেশে প্রবেশ বা দেশত্যাগ করতে না পারে, সে লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভোটের দিন দেশের সব স্থলবন্দর বন্ধ থাকলে সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনকালীন সময়ে সীমান্ত খোলা থাকলে অপরাধী বা দুর্বৃত্তদের চলাচলের ঝুঁকি থাকে। সীমান্ত বন্ধ থাকলে এ ঝুঁকি প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসে। এ কারণে সরকারের সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী ও যুক্তিসংগত বলে মনে করছেন তারা।
নির্বাচন শান্তিপূর্ণ করতে এবং যেকোনো ধরনের নাশকতা ঠেকাতে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, স্পেশাল ব্রাঞ্চের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক, নৌপরিবহন সচিব, পররাষ্ট্র সচিব, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোর ৬টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি ভোর ৬টা পর্যন্ত দেশের সব স্থলবন্দর বন্ধ থাকবে। এ সময় সীমান্ত দিয়ে বহির্গমনসহ সব ধরনের চলাচল বন্ধ রাখা হবে।
সূত্র জানায়, গোয়েন্দা সংস্থা, বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পৃথক প্রতিবেদনের পর্যালোচনার ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচনকালীন সময়ে অস্ত্র, বিস্ফোরক বা সন্ত্রাসী তৎপরতা ঠেকাতে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের দেশত্যাগ রোধ করাও এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সীমান্ত নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রের প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচন ও গণভোটের সময় দেশীয় বা বিদেশি কোনো ধরনের নাশকতা বা অন্তর্ঘাতের সুযোগ না দিতে সরকার সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ভোটের আগে সীমান্ত ব্যবহার করে অস্ত্র ও বিস্ফোরক প্রবাহের আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে ‘জিরো মুভমেন্ট’ নীতি কার্যকর করা হচ্ছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক সহিংসতার সঙ্গে জড়িত কেউ যাতে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পালিয়ে যেতে না পারে, সেটিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
নির্বাচনী সময়ে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও আনসারের দায়িত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এ অবস্থায় নিয়মিত ইমিগ্রেশন কার্যক্রম চালু থাকলে জনবল বিভক্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই সব বাহিনীর মনোযোগ এক জায়গায় রাখতে স্থলবন্দর বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তকে বাস্তবসম্মত বলা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারে আরাকান আর্মি ও দেশটির সেনাবাহিনীর সংঘাতে সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা বেড়েছে। এতে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও অস্ত্র পাচারের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ বলেন, নির্বাচনকালীন সময়ে সীমান্ত খোলা রাখা বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত অনেক সময় সন্ত্রাসী ও অন্তর্ঘাতকারী গোষ্ঠীর জন্য সহজ প্রবেশপথে পরিণত হয়।
তার মতে, নির্বাচনের আগে অপরাধচক্র সাধারণত নাশকতার উদ্দেশ্যে দেশে প্রবেশ বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঘোলাটে করে পালানোর চেষ্টা করে। স্থলবন্দর বন্ধ থাকায় এই সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে।
প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান বলেন, নির্বাচন বা গণভোটের মতো সংবেদনশীল সময়ে রাষ্ট্র বিশেষ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ তারই অংশ। এটি সম্পূর্ণ আইনসম্মত ও যুক্তিসংগত পদক্ষেপ। তার মতে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে নির্বাচনের সময় কোনো বিদেশি প্রভাব বা সন্দেহভাজন তৎপরতা বরদাস্ত করা হবে না।





