নেপালে সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ‘জেন-জি’ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দেশটিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এ পরিস্থিতিকে ভারত একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখলেও বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন— ভারতের অতীতের মতো ‘দাদাগিরি’মূলক আচরণ এখন আর গ্রহণযোগ্য নয়। তারা বলছেন, এমন আচরণই বাংলাদেশ ও নেপালকে চীনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

গত সপ্তাহে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির পদত্যাগের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি দায়িত্ব নেন। একইসঙ্গে ভেঙে দেওয়া হয় সংসদ এবং মার্চে জাতীয় নির্বাচনের দিন ঘোষণা করা হয়।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক মাধ্যমে সুশীলা কার্কিকে শুভেচ্ছা জানিয়ে লেখেন, “নেপালের ভাইবোনদের শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধিতে ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।” তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভারতের এমন কূটনৈতিক বার্তা যেন কোনোভাবেই হস্তক্ষেপমূলক না হয়।


কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক শিক্ষক ডি বি সুবেদি মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ‘বড় ভাই’ বা ‘আঞ্চলিক মোড়ল’ ভাবমূর্তি বিদ্যমান, যা পারস্পরিক সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তিনি বলেন, “ভারতের জন্য একটি স্থিতিশীল নেপাল গুরুত্বপূর্ণ, তবে এ স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ভারতের ভূমিকা গঠনমূলক ও পরোক্ষ হওয়া উচিত।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইসলামাবাদ ও ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সাম্প্রতিক উত্তেজনা ভারতের আঞ্চলিক অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলছে।


বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভারতের আগ্রাসী কূটনীতি শুধু নেপাল নয়, বাংলাদেশকেও চীনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতা হারিয়ে ভারত চলে যাওয়ার পর থেকে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। এর মাঝেই অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বেইজিং সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও চীনের ঘনিষ্ঠতা আরও দৃঢ় হয়।

সে সময় বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে ২.১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, ঋণ ও অনুদানের চুক্তি করে। পাশাপাশি, ভারতীয় গণমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, চীন লালমনিরহাটে একটি সামরিক বিমানঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে— যা ভারতের ‘চিকেনস নেক’ করিডরের কাছাকাছি।


চায়না অ্যান্ড এশিয়া থিংকট্যাংকের গবেষক ওমকার ভোলে মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ। তিনি বলেন, “নেপালে দুর্নীতি ও বেকারত্ব থেকে আন্দোলনের সূচনা হলেও ভারতের উচিত হবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করা, যা দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে তুলবে।”

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বেইজিংমুখী কূটনৈতিক অভিমুখ ভারতের জন্য, বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার প্রশ্নে, গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠতে পারে।


২০১৫ সালে নেপালের সংবিধানে মধেশিদের উপেক্ষার অভিযোগ তুলে ভারত অঘোষিত অবরোধ দিয়েছিল, যা চার মাস স্থায়ী হয়। সেই অবরোধে ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত নেপালের অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে পড়ে, এবং এর জেরে কাঠমান্ডু চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ইতিহাস ভারতকে এখন আরও বেশি কৌশলী হওয়ার বার্তা দিচ্ছে।

ভারতীয় থিংকট্যাংক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষক শিবম শিখাওয়াত মনে করেন, ভারতের নীতি হওয়া উচিত উন্নয়ন সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সংযোগ ও জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। “দুর্নীতি, বেকারত্ব ও দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করতে পারলে ভারত এসব দেশের মানুষের কাছে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে পারবে,” বলেন তিনি।

নেপাল এখন বড় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনসন্তুষ্টি এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। এই সময় ভারতের উচিত হবে ‘বড় ভাই’ নয়, প্রকৃত প্রতিবেশীর মতো আচরণ করা। না হলে, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব শুধু আরও বাড়বে— এবং ভারতের প্রভাব ক্রমশ ক্ষয়ে যাবে।