২০২৫ সালের জানুয়ারির শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্ক ছিল চরম শীতল পর্যায়ে। ওয়াশিংটনের চোখে তখন ইসলামাবাদ ছিল তালেবানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেকটাই একঘরে। ভয়াবহ বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা ও সাম্প্রতিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও পাকিস্তানের অর্থনীতি তখনও বহিরাগত অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল ছিল।


সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানকে দেখা হতো অনির্ভরযোগ্য এবং সীমিত কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন রাষ্ট্র হিসেবে। দেশটির শক্তিশালী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানকে বিবেচনা করা হতো অস্বচ্ছ, দ্বিমুখী নীতিতে অভ্যস্ত এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অনিচ্ছুক হিসেবে। অনেক বিশ্লেষক সতর্ক করেছিলেন, পাকিস্তান এক দশকের মধ্যে বা ১৯৯০-এর দশকের পর সবচেয়ে বড় জাতীয় নিরাপত্তা সংকটে পড়তে পারে।


কিন্তু ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এই চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। অল্প সময়ের মধ্যেই পাকিস্তান যেন পরিত্যক্ত রাষ্ট্র থেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়। দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন ও পরিবর্তনশীল পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে উঠে আসে ইসলামাবাদ।


শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টারাও পাকিস্তানকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাদের উদ্বেগের কারণ ছিল। তখন ওয়াশিংটনে ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ‘ইন্ডিয়া ফার্স্ট’ নীতিতে এগোবে, কোয়াড জোটকে শক্তিশালী করবে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে।


তবে সময়ের সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিপথ, নাগরিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা, সামরিক সক্ষমতার প্রশ্ন এবং কূটনৈতিক অনমনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। এসব কারণে ভারতকে একমাত্র আঞ্চলিক স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে দেখার ধারণা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে শুরু করে।


এ অবস্থায় পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে নীরব সন্ত্রাসবিরোধী যোগাযোগের মাধ্যমে। ইসলামাবাদের বাস্তব সহযোগিতার ইঙ্গিত ওয়াশিংটনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মার্চ মাসে ট্রাম্প এক জাতীয় ভাষণে হঠাৎ পাকিস্তানের ভূমিকার প্রশংসা করলে নীতিনির্ধারক মহলে বিস্ময় সৃষ্টি হয়। এতে স্পষ্ট হয়ে যায়, পাকিস্তানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে পরিবর্তন আসছে।


এই সুযোগ দ্রুত কাজে লাগায় ইসলামাবাদ। প্রতিটি ছোট সহযোগিতামূলক পদক্ষেপই ওয়াশিংটনে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং সেই প্রশংসাই সম্পর্ককে আরও গভীর করে তোলে। একসময় যাদের কাছে পাকিস্তান ছিল তুচ্ছ, তারাই এখন দেশটিকে কার্যকর ও নমনীয় অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করতে শুরু করেন।


মে মাসে ভারত-পাকিস্তানের স্বল্পমেয়াদি কিন্তু তীব্র সংঘর্ষ এই পরিবর্তনকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে। পাকিস্তানের সামরিক শৃঙ্খলা, কৌশলগত মনোযোগ ও সক্ষমতা ট্রাম্প প্রশাসনকে চমকে দেয়। এতদিন যাকে ক্ষয়িষ্ণু শক্তি মনে করা হচ্ছিল, তাকে আবার গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়।


এর প্রভাব পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কৌশলগত মানচিত্রেও। পাকিস্তান হয়ে ওঠে ট্রাম্পের দক্ষিণ এশিয়া কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই সঙ্গে দেশটির সামরিক আধুনিকীকরণে গতি আসে। কমান্ড কাঠামো পুনর্গঠন করা হয় এবং ‘চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস’ নামে নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়, যেখানে দায়িত্ব পান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।


ভারত ও পাকিস্তানের সংঘর্ষ থামাতে ট্রাম্পের মধ্যস্থতা এবং সেই প্রক্রিয়ায় দুই দেশের ভিন্ন প্রতিক্রিয়াও ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাব ফেলে। পাকিস্তানের কৃতজ্ঞতা ও সহযোগিতার মনোভাব যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।


এরই ধারাবাহিকতায় আসিম মুনির ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মহলে আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজে তার আমন্ত্রণ এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সফর পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।


২০২৬ সালের শুরুতে পাকিস্তান এখন ট্রাম্পের উদীয়মান দক্ষিণ এশিয়া ও দূরপ্রাচ্য কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে। ইরান, গাজা পরিস্থিতি এবং চীনের আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলায় ইসলামাবাদ যুক্তরাষ্ট্রকে একাধিক কৌশলগত সুযোগ দিচ্ছে।


ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বছরের শুরুতে যে সম্পর্ক ছিল দ্বিধাগ্রস্ত ও সীমিত, তা এখন কৌশলগত কেন্দ্রে অবস্থান করছে। ‘ইন্ডিয়া ফার্স্ট’ যুগ আপাতত থেমে গেছে বলেই মনে হচ্ছে, যদিও ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।


পাকিস্তানের এই রূপান্তর এখনও চলমান। চূড়ান্ত চিত্র স্পষ্ট না হলেও এর ভূরাজনৈতিক প্রভাব ইতোমধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য নতুন করে নির্ধারণ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতেও মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।


সূত্র: ওয়াশিংটন টাইমস