বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া। তাঁর জবানবন্দিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার নানা তথ্য উঠে এসেছে। পাশাপাশি গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ শাসনামলে সশস্ত্র বাহিনীতে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বেচ্ছাচারী ভূমিকার বিষয়ও এতে উঠে আসে।


জবানবন্দিতে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, র‍্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর জিয়াউল আহসান ক্রমেই উচ্ছৃঙ্খল হয়ে ওঠেন এবং তার সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।


তিনি জানান, র‍্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদের সঙ্গে এডিজি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন জিয়াউল আহসান। এরপর আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট (এএসইউ) সূত্রে জানা যায়, কর্নেল জিয়া অস্বাভাবিক হারে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে তিনি নিজের আবাসিক ভবনে সশস্ত্র গার্ড রাখেন, বাসায় অস্ত্র মজুত করেন এবং পুরো ফ্ল্যাটে সিসিটিভি স্থাপন করেন। এসব বিষয়ে সামরিক নিয়ম মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হলেও পরবর্তীতে তার আচরণ আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।


ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল তাঁকে জানান, জিয়াউল আহসানের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, তাকে বোঝানো প্রায় অসম্ভব। একপর্যায়ে নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল তারেক সিদ্দিকী, এমএসপিএম এবং তার কোর্সমেট কর্নেল (বর্তমানে মেজর জেনারেল) মাহবুবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে জিয়াউল আহসান তাঁর নির্দেশ অমান্য করতে শুরু করেন। পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তাকে ক্যান্টনমেন্টের পশ্চিম অংশে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ ঘোষণা করা হয়, যদিও পূর্ব অংশের আবাসনে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় তৎকালীন লগ এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মিজানকে, যার ফলে তাকেও নিরাপত্তা উপদেষ্টার অসন্তোষের মুখে পড়তে হয়।


জবানবন্দিতে সাবেক সেনাপ্রধান আরও বলেন, ১৯৯৬-২০০১ সময়কালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে দেশের একমাত্র ক্ষমতাসীন শক্তিতে পরিণত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। যুদ্ধাপরাধের বিচার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং সংবিধান লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধানসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীতে মেধাবী ও স্বাধীনচেতা কর্মকর্তাদের ‘বিএনপি বা জামায়াতপন্থি’ আখ্যা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং তাদের জায়গায় আত্মীয়তা, পূর্বপরিচয় বা আনুগত্যের ভিত্তিতে অনুগত কিন্তু অযোগ্য কর্মকর্তাদের বসানো হয়। ২০০৯ সাল থেকেই একদল নিরেট অনুগত কর্মকর্তা শেখ হাসিনার এজেন্ডা বাস্তবায়নে প্রস্তুত হয়ে ওঠেন।


তিনি বলেন, মেজর জেনারেল তারেক আহমেদ সিদ্দিকীকে নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর তিনি দ্রুত প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের মাঝখানে প্রভাব বিস্তার করেন। পদোন্নতি ও সামরিক কেনাকাটাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ফাইল তার অনুমোদন ছাড়া এগোত না। শত শত কোটি টাকার সামরিক কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এসবের কোনো নথিপত্র রাখা হয়নি। এতে প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্র কোথায়, তা কর্মকর্তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় এবং তারা সেনাপ্রধানকে পাশ কাটিয়ে নিরাপত্তা উপদেষ্টার কাছে তদবির শুরু করেন।


জবানবন্দিতে বলা হয়, তারেক সিদ্দিকী ধীরে ধীরে ডিজিএফআই, এনএসআই, এএফডি, বিজিবি, আনসার, এনটিএমসি, ডিজিডিপি ও র‍্যাবের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে বাধা পান, সেখানে বিদ্যমান কর্মকর্তাদের সরিয়ে নিজের অনুগতদের বসান। তার নির্দেশনায় ডিজিএফআই, এনএসআই ও র‍্যাব গুম, খুন, অপহরণ, জমি দখল, চাঁদাবাজি, নির্যাতন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়।


উল্লেখ্য, গত ১৫ বছরে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার অভিযোগে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি শেষ হয়েছে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আগামী ১৪ জানুয়ারি আদেশের জন্য দিন ধার্য করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনালে এ মামলায় সাক্ষ্য দেবেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া।