সুইডেনের উত্তরাঞ্চলে, এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো একটি চার্চকে তার স্থান থেকে পুরোপুরি স্থানান্তর করা হচ্ছে। এই ব্যতিক্রমী পদক্ষেপটি নেওয়া হয়েছে খনি খননের কারণে সৃষ্ট ভূমিধসের ঝুঁকি থেকে চার্চটিকে রক্ষা করতে।
১৯১২ সালে নির্মিত, ১১৪ বছরের পুরোনো এই লাল কাঠের চার্চটি এখন একটি বিশাল ট্রেলারের ওপর চাপানো হয়েছে এবং এটি ধীরে ধীরে নতুন শহরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫০০ মিটার গতিতে চলা এই যাত্রা পাঁচ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করবে, যা সম্পন্ন হতে দুই দিন সময় লাগতে পারে।
কিরুনা শহরের কেন্দ্রটি এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে লৌহ আকরিক খনি খননের কারণে ভূমিধস এবং ফাটলের ঝুঁকিতে রয়েছে। এই ঝুঁকি থেকে শহরটিকে রক্ষা করতে এর অনেক ভবন স্থানান্তর করা হচ্ছে। এই স্থানান্তরিত ভবনগুলোর মধ্যে চার্চের স্থানান্তর সবচেয়ে অনন্য ও উল্লেখযোগ্য ঘটনা। শহরটি আর্কটিক সার্কেল থেকে ১৪৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত।
চার্চ স্থানান্তরের এই যাত্রা শুরু হয় ভিকার লেনা জার্নবার্গ এবং বিশপ আশা নাইস্ট্রোমের আশীর্বাদ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। এরপরই ট্রেলারের ইঞ্জিন চালু হয় এবং বিশাল চার্চটি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করে। প্রথম ঘণ্টায় এটি মাত্র ৩০ মিটার এগিয়ে যায়। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হন।
সুইডেনের সাংস্কৃতিক কৌশলবিদ সোফিয়া লাগারলোফ মাত্তা বলেন, \"এখানে বিশাল জনসমাগম হয়েছে। শুধু কিরুনা বা সুইডেন থেকেই নয়, বিভিন্ন ভাষার মানুষ এখানে এসেছেন। মনে হচ্ছে, যেন চোখের সামনে ইতিহাস তৈরি হচ্ছে।\"
এই স্থানান্তরের দায়িত্বে থাকা প্রকল্প ব্যবস্থাপক স্টেফান হোমব্লাড জোহানসন বলেন, \"এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। কাজটা অনেক বিশাল ও জটিল, এখানে কোনো ভুলের সুযোগ নেই। তবে সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে।\"
২০১০ সালের মাঝামাঝি থেকে কিরুনার অন্যান্য ভবন নিরাপদ এলাকায় সরানো শুরু হয়। অধিকাংশ ভবন ভেঙে পুনর্নির্মাণ করা হলেও কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা অক্ষত অবস্থায় সরানো হয়েছে। এর মধ্যে আছে ইয়ালমার লুন্ডবোমসগার্ডেনের তিনটি পুরোনো কাঠের বাড়ি এবং ইয়ালমার লুন্ডবোমের বাড়ি। এছাড়া পুরোনো সিটি হলের ঘড়ির টাওয়ারটিও সরিয়ে নতুন সিটি হলের পাশে স্থাপন করা হয়েছে।
সুইডেনের আইন অনুযায়ী, কোনো ভবনের নিচে খনি খননের অনুমতি নেই। কিরুনার একটি উন্নয়ন সংস্থার সিইও রবার্ট ইলিতালো বলেন, \"মানুষ হঠাৎ ফাটলের মধ্যে পড়ে যায় না, বরং সময়ের সঙ্গে ফাটলগুলো পানি, বিদ্যুৎ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই অবকাঠামো ধসে পড়ার আগেই মানুষকে সরিয়ে আনতে হয়।\"
লৌহ আকরিক খনি অপারেটর এবং কিরুনার সবচেয়ে বড় নিয়োগদাতা এলকেএবি পুরো শহর স্থানান্তরের খরচ বহন করছে, যার আনুমানিক ব্যয় ১০০০ কোটি সুইডিশ ক্রোনা (প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার)।
কিরুনা চার্চের উচ্চতা ৩৫ মিটার, প্রস্থ ৪০ মিটার এবং ওজন ৬৭২ টন। এটি একসময় ১৯৫০ সালের আগের সুইডেনের সবচেয়ে সুন্দর ভবন হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। এত বিশাল ভবন স্থানান্তর করা একটি জটিল প্রক্রিয়া। প্রকৌশলীরা পুরো ভবনটি ইস্পাত বিমের ওপর স্থাপন করে স্বচালিত মডুলার ট্রান্সপোর্টারের সাহায্যে অক্ষত অবস্থায় সরিয়ে নিচ্ছেন।
জোহানসন বলেন, \"সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল রাস্তা প্রস্তুত করা, যাতে এত বড় ভবন পার হতে পারে। আমরা রাস্তাটিকে ২৪ মিটার প্রশস্ত করেছি, ল্যাম্পপোস্ট, ট্রাফিক লাইট সরিয়েছি এবং একটি সেতুও ভেঙে ফেলেছি।\"
গোথেনবার্গ থেকে গাড়ি চালিয়ে এই দৃশ্য দেখতে আসা লেনা এডকভিস্ট বলেন, \"আমি খুব বেশি চার্চে যাই না, তবে এটি আমার ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ। ওরা এটিকে না ভেঙে পুরোটা সরাচ্ছে, এটা আমাদের জন্য গর্বের।\"
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ব্যবস্থাপক কিয়েল ওলভসন বলেন, \"বছরের পর বছর প্রস্তুতির পর অবশেষে আমরা এগোতে শুরু করেছি। আমি খুব আনন্দিত এবং মুহূর্তটা উপভোগ করছি। আবহাওয়া ভালো এবং আমি নিশ্চিত সবকিছু মসৃণভাবে চলবে।\"
চার্চ অক্ষত অবস্থায় স্থানান্তরের সবচেয়ে সংবেদনশীল কাজগুলোর একটি হলো এর ভেতরের ঐতিহাসিক সম্পদ, বিশেষ করে প্রিন্স ইউজেনের আঁকা বিশাল বেদিচিত্রটি রক্ষা করা। জোহানসন বলেন, \"এই ছবিটি সরাসরি ইটের দেয়ালে লাগানো, তাই এটি সরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই স্থানান্তরের সময় ছবিটি চার্চের ভেতরেই ঢেকে রাখা হয়েছে।\"
স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এই স্থানান্তর কেবল একটি ঘটনা নয়, বরং একটি গভীর আবেগঘন মুহূর্ত। সোফিয়া লাগারলোফ মাত্তা বলেন, \"ছোটবেলায় আমি দাদির হাত ধরে প্রথমবারের মতো এই চার্চে এসেছিলাম। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এটি আমাদের মিলনস্থল ছিল।\" মাত্তা আরও বলেন, \"এই স্থানান্তর আমাদের আনন্দ ও বেদনার স্মৃতিগুলো ফিরিয়ে এনেছে, আর আমরা সেই স্মৃতিগুলো সঙ্গে নিয়ে নতুন শহরে যাচ্ছি।\"
জোহানসন, যিনি একজন প্রকৌশলী এবং চার্চের গসপেল দলের সদস্য, বলেন, \"আমার কাছে এটি একটি বিশেষ কাজ। ১০০ বছর আগে এই চার্চটি এলকেএবি পৌরসভা তৈরি করেছিল। এখন আমরা এটিকে নতুন শহরে সরিয়ে নিচ্ছি, কারণ আর কোনো বিকল্প ছিল না।\"
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বুধবার সন্ধ্যার মধ্যেই চার্চটি নতুন শহরের কেন্দ্রে পৌঁছানোর কথা ছিল।





