জয়পুরহাট প্রতিনিধি: অগ্রাহায়ণ মাস। শুরু হয়েছে গ্রামঞ্চলে প্রাণের নবান্ন উৎসব। কৃষকদের ঘরে উঠছে নতুন ধান। পিঠা-পায়েসের সাথে নানা আয়োজনে পালিত হচ্ছে কৃষকের কাঙ্খিত নবান্ন উৎসব। এ উৎসবকে ঘিরে মেয়ে-জামাই ও স্বজনদের নিয়ে জয়পুরহাটের কালাই পৌরশহরের পাঁচশিরা বাজারে বসেছে এক দিনের ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা। ভোর ৪টা থেকে দিনব্যাপী চলে মাছ কেনা-বেচার উৎসব। এই দিনের অপেক্ষার প্রহর গুনেন এ জেলার প্রত্যক গ্রামের লোকজন। আর মেলায় ভিড় জমিয়েছেন জামাই ছাড়াও সব বয়সী মানুষ। সরকারি ক্যালেন্ডার নয়, পুঁথিগত প্রথা পঞ্জিকা অনুসারে অগ্রাহয়ণ মাসের প্রথমদিনে পাঁচশিরা বাজারে প্রতিবছর বসে বৃহত এ মাছের মেলা।
ভোরের কুয়াশা ভেদ করে পুর্ব আকাশে উকি দিচ্ছে সুর্যের আলো। সেই সাথে বইছে হিমেল বাতাস। এর মধ্যেই শীত উপেক্ষা করে ভোর রাত থেকেই মেলা জুড়ে ছিল জামাইসহ ক্রেতা-বিক্রেতা আর কৌতুহলী মানুষের ঢল। প্রায় ১০৫ বছর পূর্ব থেকে পাঁচশিরা বাজারে নবান্ন উৎসবকে ঘিরে চলে আসছে এই মাছের মেলা। নদী, দীঘি ও পুকুরের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা দেশীয় প্রজাতির টাটকা মাছে ভরপুর ছিল এই মেলা। রীতি নয়, প্রথা অনুযায়ী প্রতি বছর নবান্ন উৎসব পালন করতে আসেন সারাদেশে বসবাসরত তাদের জামায়-মেয়ে, বিয়াই-বিয়ানসহ নিকট আত্মীয়-স্বজনরা। মূলত প্রতিযোগীতা করে মেলা থেকে জামাইরা মাছ ক্রয় করে শ্বশুর বাড়ীতে নিয়ে যান। তাইতো মেলার প্রতিটি দোকানে সাজানো ছিল দেশীয় জাতের রুই, মৃগেল, কাতলা, চিতল, সিলভার কার্প, পাঙ্গাস, ব্রিগেট, বাঘাইরসহ নানা ধরনের মাছ।
এলাকার প্রবীণদের ভাষ্যমতে, পঞ্জিকা অনুসারে অগ্রহায়ণ মাসের প্রথমদিনে পাঁচশিরা মেলা বসে। এই দিনে নতুন ধান কাটার উৎসবে কৃষকদের প্রস্ততকৃত চালে প্রথম রান্না উপলক্ষ্যে এই নবান্ন উৎসব। এইদিনে এলাকার লোকজন মেয়ে-জামাই ও স্বজনদের আমন্ত্রন করেন। তাদের নিয়ে পাড়া-মহল্লায় বয়ে যায় উৎসবের আমেজ। সাথে চলে পিঠা-পুলি, পায়েস, ক্ষীর, খই ও মুড়ি খাওয়ার ধুম। এই দিনটি পাঁচশিরা বাজারে বসে জেলার বৃহৎ মাছের মেলা।
মাছ ব্যবসায়ীরা কয়েকদিন আগে থেকেই তাদের আড়ৎ ঘরে নানান জাতের বড় বড় মাছ সংগ্রহ করেন। মেলায় বিভিন্ন শ্রেনী-পেশার মানুষরা উচ্চ মুল্যে এসব মাছ ক্রয় করেন। এ বছর ৩ কেজি থেকে ৩৫ কেজি ওজনের মাছের সমাগম চখে পড়েছে মেলায়। আগের তুলনায় এ বছর মেলায় লোকজনের উপস্থিতিও ছিল বেশী। ক্রয় বিক্রয় হয়েছে অনেক ভালো। সাধ্যমত মাছ ক্রয় করেছেন অনেকে। ব্যবসায়ীরা বলছেন গত বছরের তুলনায় এবার বেঁচা-কেনা কম।
তারা লোকশানের সঙ্কায় রয়েছেন।
মেলায় এবার সর্বোচ্চ ৩৫ কেজি ওজনের একটি সিলভার কার্প মাছ বিক্রি হয়েছে ৪২ হাজার টাকায় এবং ১৯ কেজি ওজনের একটি কাতলা মাছ বিক্রি হয়েছে ২৫ হাজার টাকায়। মেলার আয়োজক না থাকলেও স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীরা প্রায় ১৫দিন আগে থেকে মেলার জন্য প্রস্তুতি নেন। আশপাশ এলাকায় মাছ ব্যবসায়ীরাই মাইকে প্রচার করেন।
মাছ ব্যবসায়ী নাজির হোসেন জানান , নানান জাতের বড় বড় মাছ সংগ্রহ করা হয়েছে। কাতলা, রুই, মৃগেল ৭’শ থেকে দেড় হাজার টাকা কেজিতে এবং বাঘাআইর ও চিতল মাছ ১৩শ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। মাঝারি আকারের মাছ ৩০০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এবার ক্রেতা কম থাকায় এখন পর্যন্ত মাছ বিক্রি তেমন হয়নি। মাছ নিয়ে হয়তো এবার বিপাকে পড়তে হবে।
মেলায় মাছ কিনতে আসা জিন্দাপুর থেকে আলাউদ্দীন বলেন ,নবান্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে গতবারের চেয়ে এবার মাছের মেলায় প্রচুর আমদানি হয়েছে তবে দাম অনেকটা বেশী।
এ উপজেলার মাত্রাই থেকে মাছ কিনতে আসেন জুয়েল হোসেন বলেন, প্রতিবছর মেয়ে-জামাই, নাতি-নাতনি ও স্বজনরা এই দিনের অপেক্ষায় চেয়ে থাকে। কষ্ট হলেও আয়োজন করতে হয়। প্রায় পাঁচ হাজার টাকায় ১০ কেজি ওজনের একটি সিলভার কার্প মাছ কিনেছি। বাড়িতে গেলে নাতি-নাতনিরা খুব খুশি হবে।
কালাই টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ তাইফুল ইসলাম ফিতা বলেন, মেলা জমজমাট তাই দেখে ভালো লাগছে। তবে কৃষকদের আলুর দাম কম থাকায় এবারে তেমন কেনাকাটা চোখে পড়ছে না।
কালাই হাট ইজারাদার আব্দুল আলিম সরকার বলেন, শুধু জয়পুরহাট নয় বিভিন্ন ডিস্ট্রিক্ট থেকে ব্যাপারীরা এ মেলায় মাছ এনে বিক্রি করেন। এবার মাছের বাজার স্বাভাবিক আছে এতে করে সবাই মাছ কিনতে পারবে।
কালাই উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তৌহিদা মোহতামিম জানান, নবান্ন উৎসব উপলক্ষ্যে কালাই উপজেলা ৫ শিরা বাজারে মাছের মেলা আয়োজন করে থাকে। এটা শুধু মাছ বিকিকিনি নয় আনন্দ উৎসবও বটে। যেখানে কেনা-বেচা ক্রয় করা ছাড়া অনেকে শুধু দেখতে আসেন। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছসহ বিক্রি করা হয়। আমরা মাছ চাষে আগ্রহী করতে এবং মৎস চাষীদের সবসময় পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। আগামীতে এই মেলার পরিধি আরো বাড়বে বলে আমি আশাবাদী।





