ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের মত সংগঠনের হোমগ্রাউন্ড না, কোনদিন ছিলও না। এই যে শিবিরকে এত ছেলেপেলে ভোট দিলো, এদের ৮০% এর বেশি শিবিরের কেউ না। এত কর্মী-সমর্থক শিবিরের থাকা সম্ভব না তাদের ক্যাডারভিত্তিক ক্রাইটেরিয়াগুলার কারনে। তো কিভাবে শিবির জিতলো চলুন একটু দেখি আসি।
১)সাদিক কায়েম ফ্যাক্টরঃ
সাদিক কায়েম জুলাইয়ের প্রধান নেতাদের মধ্যে একমাত্র ব্যক্তি, যার নামে কোন বদনাম নাই। সাদিক কায়েম চুরি-লুট-দুর্নীতির সাথে তো নাইই, বেয়াদবির সাথেও নাই। তাকে ক্যাম্পাসের ছেলেমেয়েরা যথেষ্ট সম্মান করে। আমি যাকেই জিজ্ঞেস করি সেই তার ব্যাপারে পজিটিভলি বলে। সাদিকের সাথে আমার জীবনে মাত্র তিনবার দেখা হইসে, তাও অভ্যুত্থানের অনেক পরে। অসম্ভব ভদ্র ছেলে। আবার, পলিটিক্যালি দারুন শার্প। জুলাইয়ে মাহফুজ নামের তথাকথিত বিড়াল তপস্বী যে পজিশন অকুপাই করেছে, সেখানে সাদিক কায়েম গেলে বাংলাদেশ আজকে অন্য জায়গায় থাকতো। জুলাইয়ের পরে যা ঘটেছে, এরপর মানুষের মধ্যে ধারনা তৈরি হয়েছে যে সাদিক কায়েম জুলাইয়ের প্রধান চরিত্র যে কিনা বঞ্চিত। এইটা তাকে সিগনিফিক্যান্ট এডভান্টেজ দিয়েছে। সাদিকের আরেকটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সে বেয়ার মিনিমামে বিশ্বাস করে না। সে সেরাটা বের করে আনতে চায় যেকোন পরিস্থিতিতে। এইটা তার ব্যাপারে আমাকে কেউ বলে নাই। আমার মানুষ সম্পর্কে রিডিং থাকে, এইটা সাদিক কায়েমের ব্যাপারে আমার রিডিং।
সবচে বড় কথা, ঢাবির শিক্ষার্থীরা এখন আর রাজনৈতিক নেতা চায় না, চায় তাদের মতই একজন ছাত্র যে নেতৃত্ব দিতে পারে।
২)শিবিরের ভিকটিমহুডঃ
বাংলাদেশে ভিকটিমহুডের সিমপ্যাথি সবসময়েই ভোটের ময়দানে একটা পুশ ফ্যাক্টর। এই যে দেখেন নুরুল হক নুরকে মানুষ কম গালি দেয় না, কিন্তু মার খাওয়ার পর সবাই তার ব্যাপারে পজিটিভ। শিবির যে অবর্ননীয় অত্যাচার বিগত দেড় দশকের বেশি সময় সহ্য করেছে, এটা শিবিরের প্রতি ঢাবিতে সিমপ্যাথি বাড়িয়েছে। শিবিরের এই মার খাওয়ার ব্যাপারটা কিন্তু ঢাবিতে সাধারন ছাত্রের ওপরেও চলে এসেছিলো। আমাদের সময়ের আগে থেকেই যার তার ওপরে শিবির ট্যাগ দিয়ে চড়াও হওয়ার বিষয়টা ক্যাম্পাসে চলে আসছিলো, কত হাজার শিক্ষার্থী যে এর শিকার তা বাইরে থেকে বোঝা অসম্ভব। শিবিরকে ভোট দেয়ার পেছনে এই ক্ষোভেরও একটা স্পষ্ট ভুমিকা থাকতে পারে।
৩)অন্যদের ক্যাম্পেইন স্ট্র্যাটেজিঃ
বাগছাস এবং ছাত্রদল একপ্রকার আত্মতৃপ্তিতে ভুগেছে তাদের ক্যাম্পেইন নিয়ে। বাস্তবতা হলো, বাগছাসের কোন ক্যাম্পেইনই ছিল না, কোন ক্যাম্পেইন হয়ই নাই মানে তারা করতে পারে নাই। ছাত্রদল প্রচুর টাকা পয়সা খরচ করেছে, কিন্তু আবিদ এবং মায়েদের ক্যাম্পাসে যে ইমেজ, তাতে ছাত্রদলের পক্ষে কোনভাবেই ভিপি এবং এজিএসে জেতা সম্ভব ছিল না। আমি আমার ছাত্রদলের বন্ধুবান্ধবকে দুষ্টুমি করে বলতাম, কিরে, সন্ধ্যা হলেই তো তোদের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, আজকে রাতে মুক্তিযুদ্ধ করবি না?? ওরা তখন শিবিরের ব্যাপারে আমাকে অনেক কথাই বলতো, যার কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক আমার কাছে স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রচারনা ঢাবি ক্যাম্পাসে কয়েকটা চ্যালেঞ্জের জন্ম দেয়।
১)ছাত্রলীগের ট্রমা ফিরে আসা-মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলেই ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের পেটাতো, এই ট্রমাকে এসব প্রচারনা ট্রিগার করেছে।
২)আওয়ামী রাজনীতির কপি পেস্ট-মানুষের কাছে এটাকে আওয়ামী রাজনীতির ভাঙ্গা ক্যাসেট হিসেবেই দেখেছে। ফলে আওয়ামী রাজনীতির পুরো ব্যাগেজ তাদেরকে টানতে হয়েছে।
৩)নিজস্ব বয়ান মুক্তিযুদ্ধের কাঁথা-কম্বলের নিচে চাপা পড়া-মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতি করতে গিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক বয়ানকেই তুলে আনতে পারে নাই।
৪)ছাত্রদল সংশ্লিষ্টদের এরোগ্যান্সঃ
এটা নিয়ে অধিকাংশ মানুষ বিরক্ত ক্যাম্পাসে। কি সোশ্যাল মিডিয়া আর কি মাঠ ময়দান-তারা মনে করে ক্ষমতা তো কনফার্মই। বাগছাসকে মানুষ সরকারী দল মনে করে এবং ছাত্রদলকে ছাত্রলীগের কপি। এটা ইচ্ছা করে কেউ মনে করে না, তাদের আচরনের জন্য মনে করে। এর শতভাগ ফায়দা নিয়ে শিবির ঠিক সেভাবেই তাদেরকে ফ্রেইমিং করে। ঢাবিতে সবসময় এন্টাই এস্ট্যাবলিশমেন্ট ভোট থাকে বেশি। পুরো এন্টাই এস্ট্যাবলিশমেন্ট ভোটের বিরাট অংশ শিবিরের বাক্সে গেছে এবার।
৫)ছাত্রী ভোটারঃ
আমি রোকেয়া, শামসুন্নাহার ও সুফিয়া কামালের মেয়েদের সাথে কথা বলে জানলাম, তারা শুধু সাদিক কায়েমকে ভোট দেয় নাই। শিবিরের পুরো প্যানেল ধরে ভোট দিয়েছে। এর প্রধান কারন হিসেবে তারা আমার কাছে উল্লেখ করেছেঃ
-ছাত্রদলকে তারা ক্যাম্পাসের জন্য আতঙ্ক ও হুমকি মনে করে
-বাগছাসকে তারা বিশৃঙ্খল, নেতৃত্বহীন ও ধান্দাবাজ মনে করে
-শিবিরকে তারা মন্দের ভালো মনে করে যারা সম্ভবত ছাত্রদলের হাত থেকে একটা বেয়ার মিনিমাম প্রটেকশন অফার করবে
-বামদের তারা অপরিচ্ছন্ন, নেশাখোর ও লীগের দোসর মনে করে, যদিও মেঘমল্লারের ব্যাপারে অনেকেই বিভিন্ন কারনে পজিটিভ।
৬)প্রতিদ্বন্দী সংগঠনগুলোর প্রস্তুতির অভাবঃ
এটা সবচেয়ে বড় কারন। শিবির আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্স করে ক্যাম্পাসে প্রচন্ড শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে আওয়ামী লীগের আমলেই, যেটা অন্যরা পারে নাই। ছাত্রদল তো মোটেই পারে নাই। জেনারেশন জেডের সাথে তাদের ইন্টার্যাকশান হয়েছে ভয়ানক কম এবং তারা পরিস্থিতি না বুঝেই ক্যাম্পাসে নাইন্টিজের পলিটিক্স করতে শুরু করেছে। ছাত্রদলের পুরো দুইটা জেনারেশন ঢাবিতে ছিল না। ক্যাম্পাসের ছেলেমেয়েরা কিভাবে ভাবে সেটাই তারা জানে না। আর বাগছাস নিজেদের পেছনে নিজেরা আঙ্গুল দিয়েই কুল পায় না। সেই সাথে মাহফুজ আলমের চাকর বাকর ইমপোস্টার ইন্টেলেকচুয়ালরা বাগছাসের ক্যাম্পেইনের ডিরেক্টর হওয়াতে বাগছাস নিজেদের প্রথম বড় সুযোগ হারিয়েছে। তাদের খবরও ছিল না যে ছাত্রদল বাই ডিফল্ট যেখানে দাঁড়াবে, অন্তত ২০% ভোট তাদের হাতে চলে আসবেই। একটু চেষ্টা করলেই সেটা ৩০% এ চলে যাবে। বাগছাসের এই কম্পিটিটিভ এজ থাকবে না, পুরোটাই তাদের আর্ন করে নিতে হবে। বাগছাস মূলত ডাকসুর রাজনীতিতে ছাত্র ইউনিয়নের ক্যাম্পেইনের ফুট সোলজার হিসেবে ইউজড হয়েছে৷ কিন্তু তাদের এটা বোঝার ক্ষমতাই নাই।
৭)সামাজিক ইসলামাইজেশানঃ
আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের প্রতিক্রিয়ায় ও গ্লোবাল পোস্ট এনলাইটেনমেন্টের প্রভাবে বাংলাদেশের সমাজ ইসলামাইজড হয়েছে এবং সমাজে ইসলাম-রাজনৈতিক ইসলাম উভয়ের প্রভাবই বেড়েছে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে সমাজের উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়েছে ইসলামবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে। এই লড়াইয়ের এসেন্স ধারন করে, এমন দলের প্রতি সমাজের উল্লেখযোগ্য একটা অংশের সমর্থন থাকবে, অন্তত ১৫-২০% ভোট আছে এই অংশের মানুষদের। আওয়ামী লীগের এক্সিস্টিং ভোটব্যাংকের প্রায় চার গুন সেটা। বিএনপি আওয়ামী লীগের কল্পিত ভোটব্যাংকের আশায় এই পুরোটাকে জলাঞ্জলি দিতে চলেছে।
সবশেষ আমি শিবিরকে বলবো, আত্মতৃপ্তিতে ভোগার কোন সুযোগ নাই।মানুষ আপনাদেরকে একটা সুযোগ দিয়ে দেখতে চাইসে আপনারা কি করেন। চার শ্রেনীর মানুষকে সম্মান করবেন, তাদের কাজ কামে নাক গলাবেন না। তাইলে আল্লাহ আপনাদের সম্মানিত করবেন।
১)নারীদেরকে সম্মান করবেন। মিসোজিনি যা করার আমি করবো। এসবের মধ্যে আপনাদের এসে কাজ নাই।
২)দুর্বলকে সম্মান করবেন। সব ধরনের দুর্বল। তবে দুর্বলের ভেক ধরা শয়তানকে কোন সুযোগ দেবেন না।
৩)আলেম ও সুফীদেরকে সম্মান করবেন। বাংলাদেশের সুফীদের ব্যাপারে আপনাদের অতীতের এলার্জি থেকে বের হয়ে আসবেন। আপনাদের এবারের সাফল্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ কারন, আপনারা সালাফী ইখওয়ানী কোন রেটোরিক এডপ্ট করেন নাই। সালাফী-সুফী উভয় চিন্তাকেই স্পেস দিয়ে আপনাদের রাজনীতি করতে হবে।
৪)লিবারেলিজমকে ইনসিকিউর না করে চলতে হবে আপনাদের। লিবারেলরা ইসলামবিদ্বেষীও যদি হয়, তাদেরকে নিজেদের মত থাকতে দেবেন। মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুকে জনগন গুরুত্ব দেয় নাই। কিন্তু আপনাদের যদি ক্যাম্পাসে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিতে দেখা যায়, কি হয় শুধু দেখবেন।
এই মুহুর্তে শিবিরের ফরজ হচ্ছে, ক্যাম্পাসে পলিটিক্যাল এলাই খুজে বের করা। দেরি করলে মুসিবত আছে। ছাত্রদল ও বাগছাসের জন্য এখন স্মার্ট মুভ হবে ক্যাম্পাসে নিজেদের রাজনীতি গুছানো।
প্রথমত, নিজেদের ছেলেপেলের পলিটিক্যাল স্কুলিং করানো, পলিটিক্যাল রিডেফিনেশান করা
দ্বিতীয়ত, ন্যাশনাল, ইন্টারন্যাশনাল, লোকাল, কনটেক্সটের সাথে নিজেদের ডিসকোর্স, ন্যারেটিভ, রেটরিককে এলাইন করা
তৃতীয়ত, যথেষ্ট সাংগঠনিক শক্তি সঞ্চয়ে মনোযোগী হওয়া
চতুর্থত, ঢাবির রাজনীতিতে ক্যাম্পাসের বাইরের লোকজনকে টেনে আনা থেকে সতর্কভাবে বিরত থাকা। কাল বিকেল ও রাতের ঘটনা ধরে নিতে পারেন ছাত্রদলের আরেকটা ডাকসুকে খেয়ে ফেলেছে।
সবশেষে, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনে থাকা আমার প্রিয় অনুজদেরকে বলি, ক্যাম্পাসে ন্যাস্টিনেসের চর্চা করলে আপনারা সবাই হারবেন। জেন্টলম্যানশিপ, স্পোর্টসম্যানশিপ দিয়ে আগান। আমরা যেন আপনাদের ছোটভাই হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময় আনন্দ ও গর্বে বুকের ছাতি চওড়া হয়ে যায় এমন একটা ঢাবি তৈরি করেন। এই সবুজ ক্যাম্পাসটা ছেড়ে আমরা যারা চলে গেছি, মানুষের কাছে আপনাদের সম্মানিত হতে দেখা ছাড়া আমাদের আর কিছুই চাওয়ার নাই।
ঢাবি ঢাকার বাকি অংশের তুলনায় প্রায় মফস্বলে পরিনত হয়েছে। এটা ক্যাম্পাস থেকে বের না হলে বুঝতে পারবেন না। বসুন্ধরা, ধানমন্ডি, গুলশানের ছেলেপেলের সাথে ওঠাবসা করেন। এনএসইউ, ব্র্যাক, ইস্টওয়েস্ট, নটর ডেম, ভিএনসির ছেলেমেয়েদের সাথে কথা বলেন। ইরান, পাকিস্তানের লিডিং বিশ্ববিদ্যালয়গুলাকে দেখেন। ওরাও গরীব, আমরাও গরীব। কম বাজেটে কিভাবে ভালো করা যায় ওদের দেখলে বুঝা যাবে। আমাদের ক্যাম্পাসটা অনেক পিছায়ে যাচ্ছে। আমাদেরকে ভবিষ্যতটা ধরতে হবে। নেক্সট দশ বছর ডিটারমাইন করবে বাংলাদেশ থাকবে কি থাকবে না।
আপনাদেরকে নিজেদের বুক দিয়ে বাংলাদেশটাকে ধরে রাখতে হবে।





