জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত অপরাধের দায় স্বীকার করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেছেন, ‘তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নির্দেশে ছাত্র-জনতার ওপর গণহত্যা চালানো হয়। এত বড় গণহত্যা আমার দায়িত্বকালীন সংঘটিত হয়। তার দোষ আমি স্বীকার করছি।’

এ সময় তিনি গণহত্যার শিকার প্রত্যেক পরিবার ও আহত ব্যক্তি, দেশবাসী ও ট্রাইব্যুনালের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আওয়ামী লীগের ভোট ডাকাতি কীভাবে সংঘঠিত হয়েছিল, সে কথাও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন। গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দি দেন। এ মামলার রাজসাক্ষী হয়েছেন সাবেক এই আইজিপি।

জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাসহ ব্যাপক নৃসংশতার জন্য তিনি অপরাধবোধ এবং বিবেকের তাড়নায় নিজ থেকে অ্যাপ্রুভার (রাজসাক্ষী) হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বলে জানান। গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে আসামি হিসেবে তিনিও রয়েছেন। রাজসাক্ষী হিসেবে এ মামলার তিনি ৩৬তম সাক্ষীর জবানবন্দি দেন।

জবানবন্দিতে আবদুল্লাহ আল-মামুন ট্রাইব্যুনালকে বলেন, হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলন দমন সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে হয়েছিল। র‌্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন-অর রশীদ হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহার করে আন্দোলন দমনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল আমাকে ফোন করে জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলন দমনে লেথাল উইপন ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। এ নির্দেশের কথা সদর দপ্তরে উপস্থিত অতিরিক্ত আইজিপি প্রলয় কুমার জোয়ারদারকে জানালে তিনি ডিএমপি কমিশনারসহ সারা দেশে ওই নির্দেশনা পৌঁছে দেন।

আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়কদের গ্রেপ্তার করার প্রস্তাব দেয় ডিজিএফআই। আমি বিরোধিতা করেছিলাম। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে রাজি হই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ মোতাবেক ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে ডিবি ও ডিজিএফআই তাদের আটক করে।

জবানবন্দিতে সাবেক আইজিপি বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই থেকে প্রায় প্রতি রাতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় কোর কমিটির বৈঠক বসত। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর পুনরায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে পুলিশ বাহিনীতে রাজনৈতিক মেরূকরণ হয় এবং গোপালগঞ্জকেন্দ্রিক বলয় তৈরি হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় আমি ঢাকা রেঞ্জ পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ছিলাম। তখন আইজিপি ছিলেন জাবেদ পাটোয়ারী।

আমি জানতে পারি তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্সে ৫০ শতাংশ ব্যালট ভর্তি করে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সে অনুযায়ী ডিসি, এসপি, ইউএনও, এসিল্যান্ড, ওসি ও দলীয় নেতাকর্মীরা সরকারের পক্ষে কাজ করেন। যেসব পুলিশ অফিসার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেন, তাদের বিপিএম, পিপিএম পদক দেওয়ার মাধ্যমে পুরস্কৃত করা হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর পুলিশের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও প্রভাব আরো বৃদ্ধি পায়।

চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পূর্ণাঙ্গ জবানবন্দি

জবানবন্দিতে দেওয়া রাজসাক্ষী চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পুরো বক্তব্য এখানে তুলো ধরা হলো। তিনি বলেন, ‘আমি সাবেক আইজিপি। বর্তমানে অবসরে। এ মামলার আসামি হিসেবে জেলহাজতে আছি। আমি ১৯৮৬ ব্যাচের পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে ১৯৮৯ সালে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দিই। আইজিপি হওয়ার আগে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি, সিআইডির প্রধান, র‍্যাবের মহাপরিচালক এবং সর্বশেষ আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট পর্যন্ত আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করি।’

চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন বলেন, ‘আমাকে এ মামলায় গ্রেপ্তারের পর স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে ইচ্ছুক হলে গত ২৪ মার্চ তদন্তকারী কর্মকর্তা আমাকে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসেনের কাছে পাঠালে আমি সেদিনই তার কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিই। এই সেই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি। জবানবন্দির প্রতি পৃষ্ঠায় আমার স্বাক্ষর আছে। এগুলো আমার স্বাক্ষর। পরবর্তীকালে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠনের পর আমি দোষ স্বীকার করে পুর্ণাঙ্গ সত্য প্রকাশের অঙ্গীকার করে অ্যাপ্রুভার হওয়ার আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল সে আবেদন মঞ্জুর করে। আমি আজ পুর্ণাঙ্গ সত্য প্রকাশের অঙ্গীকার পূরণের লক্ষ্যে সাক্ষ্য দিচ্ছি।’

সাবেক আইজিপি বলেন, ‘আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। আমার বাবা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি ১৯৯০ সালে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০২৩ সালের ১১ জানুয়ারি আমার অবসরে যাওয়ার কথা ছিল। আমাকে প্রথমে দেড় বছর এবং পরে আরো এক বছর আইজিপি হিসেবে এক্সটেনশন দেওয়া হয়। আইজিপি পদে পদোন্নতি পাওয়ার জন্য সিনিয়র অফিসারদের মধ্যে গোপালগঞ্জকেন্দ্রিক গ্রুপিং ছিল। ওই গ্রুপিং যাতে প্রকাশ না হয় এবং পুলিশের সুনাম রক্ষার্থে আমাকে এক্সটেনশন দেওয়া হয়।’

চৌধুরী মামুন বলেন, ২০১৪ সালে নির্বাচনের পর পুনরায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে পুলিশ বাহিনীতে ব্যাপক রাজনৈতিক মেরূকরণ হয় এবং গোপালগঞ্জকেন্দ্রিক বলয় তৈরি হয়। পুলিশ অফিসাররা বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে এবং সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে তৎপর হয়। এসব কারণে সিনিয়র অফিসারদের পক্ষে পুলিশকে কন্ট্রোল করার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

৫০ শতাংশ ব্যালট ভরে পুলিশের পদোন্নতি

আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, ২০১৮ সালে নির্বাচনের সময় আমি ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি ছিলাম। তখন আইজিপি ছিলেন জাবেদ পাটোয়ারী। আমি জানতে পারি, তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্সে ৫০ শতাংশ ব্যালট ভর্তি করে রাখার পরামর্শ দেন। সরকারের পক্ষ থেকে সে মোতাবেক ডিসি, এসপি, ইউএনও, এসিল্যান্ড, ওসি ও দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী এসব অফিসার ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা তা বাস্তবায়ন করেন। যেসব পুলিশ অফিসার ওই নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করেন, তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে বিপিএম, পিপিএম পদক দেওয়ার মাধ্যমে পুরস্কৃত করা হয়।

চিফ প্রসিকিউটরের ব্রিফিং

চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম পরে সাংবাদিকদের বলেন, চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালে রাজসাক্ষী হিসেবে তার জবানবন্দি দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনালে তিনি তার দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল এবং তার পূর্বাবর ঘটনাগুলোরও তিনি বর্ণনা করেছেন।

মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ট্রাইব্যুনালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পর্ষদের গুম, খুন, ক্রসফায়ার এবং সর্বশেষ জুলাই আন্দোলনে মারাত্মক দমন-পীড়নের পুরো বিবরণ তুলে ধরেন।

তথ্য সূত্র: আমার দেশ