বাংলাদেশই ছিল খালেদা জিয়ার একমাত্র ঠিকানা—কারাগার, গৃহবন্দিত্ব, অসুস্থতা আর একাকিত্বের মধ্যেও তিনি কখনো দেশ ছাড়েননি। সংগ্রামী নেত্রীকে আজ আমরা বিদায় জানাচ্ছি—গুডবাই ম্যাডাম খালেদা জিয়া।


খালেদা জিয়াকে সাধারণত আপসহীন নেত্রী বলা হয়। তবে তার চরিত্রের সংক্ষিপ্ত রূপটি বোঝাতে সাহসী ও সংগ্রামী নেত্রী বলা আরও উপযুক্ত। ভাবুন, মৃত্যুর সঙ্গেও তিনি আপস করতে রাজি হননি।


আমরা সবাই জানি, মৃত্যুই অবধারিত। কিন্তু ফেব্রুয়ারি ২০১৮-এ তাকে কারাবন্দি করার পর, অসুস্থতার মধ্যেও তিনি সংগ্রাম করেছেন। জীবনযুদ্ধে তিনি পরাজিত হননি। বিদেশি চাপের মধ্যে তাকে জেল থেকে তার ভাড়া বাড়িতে গৃহবন্দি রাখা হয় ৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত, প্রায় সোয়া ছয় বছর। এই দীর্ঘ বন্দি জীবনে গুরুতর অসুস্থতার পরও বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হয়নি। পদ্মা সেতু উদ্বোধনকালে তাকে বিশেষভাবে লজ্জিত করার প্রচেষ্টা, প্রিয় স্বজনদের সঙ্গে দেখা না দেওয়ার জোরপূর্বক নির্যাতন—এসবের মধ্যেও খালেদা জিয়া অটল থেকেছেন।


৫ আগস্ট ২০২৪-এ বন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি প্রথমে লন্ডনে গিয়ে চিকিৎসা নিয়েছিলেন এবং পারিবারিক পুনর্মিলন ঘটেছিল। কিন্তু তিনি বারবার বলেছেন, “বাংলাদেশই আমার একমাত্র ঠিকানা।” তাই উন্নত চিকিৎসার সুযোগ ত্যাগ করে আবার ফিরে আসেন বাংলাদেশে এবং ঢাকায় একাকী জীবন মেনে নেন। এটি ছিল তার দেশপ্রেমের নিদর্শন।


খালেদা জিয়ার সংগ্রাম শুরু হয়েছিল অল্প বয়সে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার স্বামী জিয়াউর রহমান যুদ্ধে যান, দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় কাটাতে হয় প্রায় নয় মাস। স্বামীর অকাল মৃত্যু ৩০ মে ১৯৮১ সালে তাকে অকাল বিধবা করে দেয়। এরপর তিনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে তার স্বামীর স্মৃতি বিজড়িত বাড়িতে থেকে পারিবারিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন।


স্বামীপ্রতিষ্ঠিত বিএনপি’র হাল ধরতে তিনি পার্টির চেয়ারপারসন হন। একজন অন্তর্মুখী গৃহবধূ থেকে বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে রূপান্তরিত হওয়া তার যাত্রা সফল হয়। অল্প সময়ে তার সততা, প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও মানবিকতার কারণে বিএনপি শক্তিশালী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।


প্রেসিডেন্ট এরশাদের শাসনামলে বিএনপি প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকার পতনের পর, ১৯৯১-এর নির্বাচনে বিএনপি বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯১-১৯৯৬-এর তার সরকারের আমলকে এখন অনেকেই শ্রেষ্ঠ হিসেবে দেখেন। দুর্নীতি কম এবং বাক স্বাধীনতা সর্বোচ্চ ছিল। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ছিল।


তিনি বাংলাদেশকে সবচেয়ে বড় উপহার দিয়েছেন—তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচন। দুইবারের এই নির্বাচন প্রক্রিয়া দেখিয়েছে, খালেদা জিয়া ক্ষমতা ছাড়তে রাজি ছিলেন এবং সকলকে সমান সুযোগের প্ল্যাটফর্মে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দিয়েছিলেন।


২০০৪ সালে ইরাক যুদ্ধের সময়ে আমেরিকার প্রস্তাবে বাংলাদেশ সেনা পাঠানোর বিষয়ে তিনি রাজি হননি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানিয়েছিলেন, “অকাল বিধবাদের বেদনা আমি বুঝি। চাই না আমার দেশের কোনো নারী সেই বেদনা সহ্য করুক।”


২০০৭ সালে সামরিক কু এবং ২০০৮-এর নির্বাচনের পর বিএনপি দুর্বল হয়, আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। এরপর প্রায় ১৫ বছর সুষ্ঠু নির্বাচনহীন আওয়ামী শাসন চলে। তবে খালেদা জিয়া দেশের জন্য তার আদর্শ ও সংগ্রাম কখনো ছাড়েননি।


তিনি ১৯৮১-২০২৪ পর্যন্ত বহু নির্যাতন, গৃহবন্দিত্ব ও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা সহ্য করেছেন। সব বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে তিনি তার মূল্যবোধ, আদর্শ ও সততার পথ অবলম্বন করেছেন। নিখাদ সততা ও সদা সংগ্রামী মনোভাব—এটাই খালেদা জিয়ার প্রকৃত সৌন্দর্য।


আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ বলেছিল, “Liberty is always an unfinished business”—স্বাধীনতা সব সময়ই অসমাপ্ত সংগ্রাম। বাংলাদেশেরও তাই। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ছিল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে দেশবাসী দারিদ্র্য ও বেকারত্ব থেকে মুক্তি পাবে। এটাই খালেদা জিয়াকে প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানোর মাধ্যম।


আপনি বাংলাদেশেই ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। আপনার একমাত্র ঠিকানা এখানেই। শান্তিতে থাকুন, গুডবাই ম্যাডাম খালেদা জিয়া।