জয়পুরহাট প্রতিনিধি:পাপ মোচন ও পূণ্য লাভের আশায় জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে অনুষ্ঠিত হলো শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী বারুণী গঙ্গা স্নান। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) ভোরের আলো ফুটতেই উপজেলার সোনামুখী তুলশীগঙ্গা নদীর ঘাটে ভিড় জমাতে শুরু করেন হাজার হাজার পূণ্যার্থী। দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ভিড় রূপ নেয় জনসমুদ্রে।

চৈত্র মাসের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে, দোল পূর্ণিমার ১২ দিন পর অনুষ্ঠিত এ স্নানকে ঘিরে প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্য বহন করছে এ আয়োজন। স্থানীয়দের বিশ্বাস—অন্য যেকোনো স্নানের চেয়ে এ দিনে গঙ্গাস্নানে হাজার গুণ বেশি পূণ্য লাভ হয়। তাই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবাই ছুটে আসেন এই পুণ্যস্নানে অংশ নিতে।

স্নানকে কেন্দ্র করে সোনামুখী ঘাটজুড়ে বসেছে দুই দিনব্যাপী প্রাণবন্ত মেলা। মেলায় গ্রামীণ জীবনের নানা উপকরণ—বাঁশ ও বেতের তৈরি চালুন, ডালি, কুলা, পাখা, কাঠ ও মাটির তৈরি সৌখিন সামগ্রী, লোহার আসবাবপত্র—সবকিছুই যেন ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। পাশাপাশি মিষ্টি, জিলাপি ও কানমুড়ির দোকানে জমেছে দর্শনার্থীদের ভিড়।

স্নানের পাশাপাশি আয়োজন করা হয় গঙ্গা পূজা, মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বলন, কীর্তন এবং মহাপ্রসাদ বিতরণ। দূরদূরান্ত থেকে আগত সাধু-সন্ন্যাসীদের উপস্থিতি পুরো আয়োজনকে করে তোলে আরও ধর্মীয় আবহমণ্ডলপূর্ণ। এ সময় এলাকাটি পরিণত হয় এক মিলনমেলায়—আত্মীয়-স্বজনদের আগমনে প্রতিটি বাড়ি হয়ে ওঠে প্রাণচঞ্চল।

বগুড়ার আদমদীঘি থেকে আসা সুদেব ঘোষ বলেন, “প্রতিবছরের মতো এবারও পরিবার নিয়ে পূণ্যলাভের আশায় এসেছি। উপবাস থেকে স্নান শেষে দান-দক্ষিণা ও গীতা পাঠ করে প্রসাদ গ্রহণ করি।”

স্থানীয় ভক্ত বিকাশ চন্দ্র স্বর জানান, “বারুণী স্নানের মাধ্যমে মানুষ মনের বাসনা পূরণের আশায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও সূর্যদেবের কাছে প্রার্থনা করেন।”

দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে পূজা করে আসা বিষ্ঠ মালাকার বলেন, “ভক্তরা তাদের মনের আশা পূরণের জন্য এখানে গঙ্গাপূজা করেন। আমি নিজ উদ্যোগে দেবী গঙ্গার বিগ্রহ তৈরি করে পূজা পরিচালনা করি।”

বারুণী গঙ্গা স্নান মেলা কমিটির সভাপতি শ্রী বাসুদেব সাহা বলেন, “প্রায় পাঁচ শতাব্দীর ঐতিহ্য ধরে এই স্নান অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। প্রতি বছরই বিপুল সংখ্যক পূণ্যার্থী এখানে সমবেত হন।”

তবে এত বড় আয়োজনের মাঝেও রয়ে গেছে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য কল্যাণ ফ্রন্ট, আক্কেলপুর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রতন কুমার শীল বলেন, “নদীতে নামা-ওঠার জন্য নিরাপদ ঘাট না থাকায় পূণ্যার্থীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। দ্রুত একটি পাকা ও নিরাপদ ঘাট নির্মাণ জরুরি।”

শতবর্ষের ঐতিহ্য, ধর্মীয় আবেগ আর গ্রামীণ সংস্কৃতির অপূর্ব সমন্বয়ে আক্কেলপুরের বারুণী গঙ্গা স্নান আজও হয়ে উঠেছে মানুষের বিশ্বাস, ভক্তি আর মিলনের এক অনন্য উৎসব।